ভারত সফর বাতিল করেছেন জো বাইডেন, চলছে নানা জল্পনা

ভারত সফর বাতিল করেছেন জো বাইডেন, চলছে নানা জল্পনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী মাসে নয়াদিল্লি সফরে আসছেন না। আগামী ২৪ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে তার অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তা আর হচ্ছে না। সফর বাতিল হওয়ায় কোয়াড সম্মেলনের তারিখ অনির্দিষ্টকালের জন্য পেছানো হয়েছে। নিউইয়র্কে শিখ নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন হত্যাচেষ্টায় ভারতীয় কর্মকর্তা জড়িত থাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের মধ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এ সফর বাতিল হলো।

গতকাল ভারতের সরকারি সূত্রে জানানো হয়, বাইডেন আসতে পারবেন না বলে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনও আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। আগামী বছরের ২৭ জানুয়ারি দিল্লিতে সেই সম্মেলন করার কথা ভাবা হয়েছিল। উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ২০১৫ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসে বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৮ সালে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। কিন্তু ‘অন্যান্য কর্মসূচির জন্য’ তিনি আসতে পারেননি। এবার বাইডেনও না আসার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমন্ত্রণে বাইডেনের সাড়া না দেওয়াটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য বড় ধাক্কা। মোদি আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য লোকসভা (ভারতের জাতীয়) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি জানায়, জানুয়ারিতে বাইডেন ভারত সফরে যাচ্ছেন না। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাইডেনই নেবেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মঙ্গলবার জানায়, আগামী বছরের অন্য কোনো সময়ে কোয়াড সম্মেলন হতে পারে। কোয়াড সদস্য দেশগুলোর অনুমতি নিয়েই নতুন এ তারিখ নির্ধারণ করা হবে। ভারতে ওই সম্মেলনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ও প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। নানা ব্যস্ততার মধ্যে কিশিদা ও আলবানিজ সফরের বিষয়টি নিশ্চিতও করেছিলেন। তবে বাইডেন না আসায় আয়োজন পিছিয়ে গেল। কোয়াড সম্মেলনে প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।

এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান নিয়ে গঠিত জোট কোয়াডের সম্মেলনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এ সম্মেলনে বাইডেনের অংশ না নেওয়া নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। অনেকের ধারণা, শিখনেতা পান্নুন হত্যাচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।

হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, বেশ কয়েকটি কারণে বাইডেন আসছেন না। এরমধ্যে পুনর্নির্বাচিত হতে প্রচারাভিযানে অংশ নেওয়া অন্যতম একটি কারণ। জানুয়ারির শেষ দিকে অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতে বাইডেন স্টেট অব ইউনিয়নে ভাষণ দেবেন। এছাড়া ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক সংকটও রয়েছে তাঁর প্রশাসনের সামনে।

প্রজাতন্ত্র দিবসে বিদেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো ভারতের ঐতিহ্য। বিশেষ করে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কভিড মহামারির কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালে বড় পরিসরে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করেনি ভারত। আমন্ত্রণ জানানো হয়নি কোনো বিদেশি অতিথিকেও। চলতি বছরের শুরুতে প্রজাতন্ত্র দিবসে মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসি ছিলেন প্রধান অতিথি।

মোদির আমন্ত্রণে বাইডেনের সাড়া না দেওয়ার পেছনে শিখনেতা পান্নুন হত্যাচেষ্টার বিষয়টি অন্তর্নিহিত বিষয় হিসেবে কাজ করতে পারে– এমন জল্পনাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। ওই হত্যা ষড়যন্ত্রের তদন্তের সূত্র ধরে এরইমধ্যে ভারতে পৌঁছেছে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইর (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) প্রধান। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কোনো মার্কিনিকে হত্যার চেষ্টাকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। অপরদিকে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়াকে একেবারেই সহ্য করবে না ভারত। এরইমধ্যে খালিস্তানপন্থিদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে কানাডার সঙ্গে শীতল যুদ্ধ চলছে নয়াদিল্লির।

বাইডেনকে যখন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তখন কানাডায় খালিস্তানি নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারতের জড়িত থাকার সন্দেহের কথা কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্রকাশ করেননি। কানাডার পার্লামেন্টে সেই অভিযোগ জানানোর কিছুদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও সে দেশের শিখ নাগরিক ও ‘শিখস ফর জাস্টিস’ সংগঠনের নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যাচেষ্টার চক্রান্তে ভারতের জড়িত থাকার অভিযোগ আনে। ওই অভিযোগে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে এক ভারতীয়কে গ্রেপ্তারের কথাও তারা জানায়। লক্ষণীয়ভাবে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের চরিত্র এক হলেও কানাডার অভিযোগ ভারত অস্বীকার করে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই হত্যাচেষ্টার অভিযোগকে ভারত ‘গুরুতর’ বলেও অভিহিত করেছে।

আরও লক্ষণীয়, বাইডেনের ভারতে না আসার খবরটি যে সময়ে জানাজানি হয়, ঠিক তখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের প্রধান ক্রিস্টোফার এ রে ভারত সফর করছেন। পান্নুন হত্যা চক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে দুই দিনের সফরে তিনি গত রোববার রাতে দিল্লি আসেন। দুই দিন ধরে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই), দিল্লির পুলিশ কমিশনার ও জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।দুই তরফের আলোচনা ও অগ্রগতি নিয়ে কোনো পক্ষই অবশ্য বিস্তারিত কিছু জানায়নি। কিন্তু পান্নুন হত্যা চক্রান্তের সঙ্গে বাইডেনের না আসা সম্পর্কযুক্ত কি না, সেই জল্পনা শুরু হয়েছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
লেখক / প্রতিবেদক

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।