বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঈদকে সামনে রেখে ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে মওসুমি চাঁদাবাজি। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলেছেন, চাঁদাবাজদের এখন টার্গেট পশুবাহী গাড়ি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, ভুইফোঁড় মালিক-শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে পশুবাহী গাড়ি দেখলেই রাস্তায় থামানো হচ্ছে। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা কোনোভাবেই কাজে আসছে না। চাঁদা দেয়া ছাড়া রাস্তায় কোনো গাড়ি চলতে পারছে না। ফেরিঘাটগুলোতে ভলান্টিয়ার সার্ভিসের নামে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজরা। রাস্তায় মালামালের ওজন মাপার নামেও চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে ইতোমধ্যেই পশুবাহী গাড়িগুলো প্রবেশ করছে। আর পশুবাহী এই গাড়িগুলোই এখন চাঁদাবাজদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে। গতকাল বিকেলে রাজধানীতে আসা একটি গরুবাহী ট্রাকের (যশোর ট- ১১-২৭৭৯) ফড়িয়ারা অভিযোগ করেছেন, পথে পথে তাদেরকে চাঁদা দিয়ে ঢাকায় আসতে হয়েছে। যশোর থেকে গরু নিয়ে ঢাকায় আসতে প্রতিটি গরুর পেছনে ৩-৪ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে বলে ওই ফড়িয়ারা অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি রুস্তুম আলী খান বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধে তারা সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় মিটিং করেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। রাস্তায় চাঁদাবাজি চলছে। পশুবাহী ট্রাক দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে চাঁদাবাজরা। তিনি বলেন, নামসর্বস্ব সংগঠনের নামে দেশজুড়ে রাস্তায় রাস্তায় এই চাঁদাবাজি চলছে। তিনি বলেন, এই মওসুমতো আর এক সপ্তাহ পড়ে থাকবে না। তাই যে যেভাবে পারছে গাড়িগুলো থেকে চাঁদা নিচ্ছে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি।
রুস্তুম আলী বলেন, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে রাস্তায় রাস্তায় স্কেল বসানো হয়েছে। সেখানে টাকা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ আছে। আবার টাকা না দিলে সমস্যা হয়। দেখা যায় এক স্কেলে মাপার পর ওজন হয় ২০ টন। আবার সেই গাড়ি অন্য স্কেলে মেপে ওজন পাওয়া যায় পৌনে ১৪ টন। এভাবে মেজারমেন্ট বেশি দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এ নিয়ে প্রায়ই শ্রমিকদের সাথে ঝামেলা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
রুস্তুম আলী বলেন, পরিবহন সেক্টরে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে যেকোনো সময় অচল হয়ে যেতে পারে এই সেক্টর।
বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা বলেন, সর্বত্রই চাঁদাবাজি চলছে। তবে চাঁদাবাজিতে নতুন সংস্করণ শুরু হয়েছে। এখন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো আগেই চাঁদা রেখে দেয়। আর সেই থেকে বিভিন্ন সেক্টরে টাকা ভাগ হয়ে যায়। আগেই সংগঠনগুলোর সাথে চাঁদাবাজদের কন্টাক থাকে। সে অনুযায়ী তাদের টাকা পৌঁছে যায়। তিনি বলেন, রাস্তায় স্কেলে গাড়ির ওজন মাপাকে কেন্দ্র করে চলছে দেদার চাঁদাবাজি। তিনি বলেন, শুধু পশুবাহী যানবাহনই নয়, ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীবাহী যানবাহনগুলো থেকেও শুরু হয়েছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। একটি পরিবহনের নাম উল্লেখ করে আলী রেজা বলেন, সায়েদাবাদ থেকে ওই গাড়িটি গাজীপুর যেতে সায়েদাবাদেই দিতে হয় ৭০০ টাকা। একটি গাড়ি সায়েদাবাদ থেকে নোয়াখালী যেতে সায়েদাবাদে ১২০০ টাকা দিতে হয়। আলী রেজা বলেন, এসব কথা বলতে গেলে মহাবিপদ। ফেরিঘাটগুলোতে সিরিয়াল দেয়ার নাম করে যানবাহন থেকে ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি চলছে।
ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মকবুল আহম্মেদ বলেন, ফেরিঘাটগুলোতে কৃত্রিম সংগঠন সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। দৌলতদিয়া ঘাটে একটি ট্রাক পার হতে সরকারি রেট হচ্ছে ১৪৬০ টাকা। আর আদায় করা হচ্ছে ৩-৪ হাজার টাকা। দেখা যায় ট্রাকে কাঁচামাল বা মাছ থাকে। তখন সিরিয়াল না পেলে কাঁচামাল পচে যাবে। তখন বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা বেশি টাকা দিয়ে ফেরিতে ওঠে। ফেরিঘাটের চাঁদাবাজির সঙ্গে সেখানকার প্রশাসনসহ সাধারণ বাসিন্দারাও জড়িত। তিনি বলেন, মানিকগঞ্জে চেকপোস্টে প্রতিটি গাড়ির জন্য এক হাজার টাকা দিতে হয়। দিনের পর দিন এই পরিস্থিতি চলে আসছে। গাড়িতে যে পরিমাণ মালই থাকুক না কেনো এই টাকা দিতে হবে। মকবুল আহম্মেদ বলেন, মানুষকে জবাই করা হচ্ছে। এ দিকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান গতকাল এক বৈঠকে পশুবাহী গাড়িকে অযথা হয়রানি না করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলেছেন, এই নির্দেশনা কোনো কাজেই আসছে না।