স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম ভারতীয় যিনি পাশ্চাত্যে বেদান্ত ও যোগ দর্শন প্রচার করেন

স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম ভারতীয় যিনি পাশ্চাত্যে বেদান্ত ও যোগ দর্শন প্রচার করেন

স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম ভারতীয় যিনি বেদান্ত ও যোগ দর্শন পাশ্চাত্যে প্রচার করেন। উত্তর কলকাতার সিমলা এলাকার দত্ত পরিবারের ছেলে নরেন্দ্র নাথ দত্তই হয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ

তার জন্ম ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারি। মা ভুবনেশ্বরী দেবী এবং বাবা বিশ্বনাথ দত্ত দুজনেরই যথেষ্ট প্রভাব ছিল তাঁর জীবনে। কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন তিনি। আঠারো বছর বয়সে তিনি যোগসাধকদার্শনিক রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে আসেন। বিবেকানন্দের সঙ্গে রামকৃষ্ণের যোগাযোগের সময়কাল ছিল মাত্র পাঁচ বছর

প্রথমদিকে নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসকে গুরু বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এমনকি তার চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ পরমহংসের ব্যক্তিত্বের প্রতি পরে তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন ও তাঁকে গুরু হিসাবে মেনে নেন। দুজন দুজনকে নানাভাবে যাচাই করে দেখেছেন।

রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থা দেখার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ প্রায় পাঁচ বছর সারা ভারত ঘুরে বেড়ান।

“তাঁর ভারত ভ্রমণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছিলেন এবং সেসব জায়গায় শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, নির্ধন সর্ব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশেছিলেন। যার ফলে তাঁর চরিত্রে অসাধারণ কিছু গুণ এসেছিল। তাঁর জীবনদর্শন পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। এই সব কিছু নিয়েই গড়ে উঠেছিলেন বিবেকানন্দ।”

ভারত ভ্রমণের সময় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসীর মত প্রধানত ভিক্ষা করে জীবনধারণ করতেন এবং মূলত পায়ে হেঁটে, আর কখনও বা অনুরাগীদের কেটে দেওয়া টিকিটে রেলপথে ভ্রমণ করতেন। বিবেকানন্দ সারা জীবন ভারতীয় সঙ্গীতের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। নিজে ভাল গান ও গাইতেন।

মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী হবার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন। ৩০ বছর বয়সে শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ যখন দেন তিনি।

১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর ওই বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় তিনি ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর বক্তৃতা ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। এরপর তিনি আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপে হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দেন এবং ক্লাস নেন।

দু-বার তিনি ইংল্যাণ্ড ভ্রমণ করেন ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এক আইরিশ নারী মিস মার্গারেট নোবেলের, যিনি পরে পরিচিত হন ভগিনী নিবেদিতা নামে। বছর দুয়েকের মধ্যে তিনি কলকাতায় চলে যান স্থায়ীভাবে এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের পয়লা মে আনুষ্ঠানিকভাবে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার এবং চিকিৎসা ও দাতব্যকাজের মধ্যে দিয়ে জনগণের সেবার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন। “ত্যাগে, তপস্যায়, আনন্দে, যন্ত্রণায়, মানুষের প্রতি ভালবাসায় তিনি উন্মোথিত ছিলেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে তিনি বেদান্ত ভিত্তিক সেবাধর্মের প্রবর্তন করেন। সেবা হয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু মানবসেবাকে একটা ধর্মসত্য রূপে উপস্থিত করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ,” বলেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু।

“তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল –বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর, জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।”

বিবেকানন্দ বলেন, আমি সাহসের সঙ্গে বলতে পারি আধুনিক গবেষকদের থেকে বাহ্যিক ও নৈতিক ব্যাপারে একটি ধর্মই একটু এগিয়ে আছে আর সেটি হল অদ্বৈত। এই কারণেই এই ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানীদের এত আকর্ষণ করে। পুরনো দ্বৈতবাদী তত্ত্বগুলি তাদের পক্ষে যথেষ্ট নয় বলেই তাঁরা মনে করেন। শুধু বিশ্বাসে একজন মানুষের চলে না। তার চাই বৌদ্ধিক বিশ্বাস।

মাত্র উনচল্লিশ বছরে তাঁর জীবনাবসান হয় ১৯০২ সালের চৌঠা জুলাই।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
লেখক / প্রতিবেদক

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।