ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী মাদাম কামার মৃত্যুদিন

ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী মাদাম কামার মৃত্যুদিন

আজ ১৩ আগস্ট ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী ভিকাজী রুস্তম কামা মাদাম কামার মৃত্যুদিন। ভিকাজী রুস্তম কামা ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাকে ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী বলা হয়।

ব্রিটিশ ভারত বোম্বাইতে একটি পারসি জরস্ত্রীয়ান পরিবারে ১৮৬১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মাদাম কামা। তার পিতার নাম ছিল শোরাবজী ফ্রামজী প্যাটেল। ছিলেন একজন আইনবিশেষজ্ঞ এবং পেশায় ব্যবসায়ী, পার্সি সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল জৈজিবাঈ শোরাবজী প্যাটেল। সেই সময় পার্সিরা ব্যবসা, শিক্ষা, শিল্প সবেতেই অগ্রণী হয়ে উঠেছিল। এমনকি সেবা ও জনহিতকর কাজেও তাঁদের অবদান ছিল স্মরণীয়। মাদাম কামার অত্যন্ত ধনী পরিবারও সেই গৌরবের অঙ্গীভূত হয়ে ওঠে।

মাদাম কামা আলেকজান্দ্রা নেটিভ গার্লস ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন। ছোটোবেলা থেকেই বহু ভাষা শিখে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি এবং ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংগ্রামকে তিনি সমর্থন করতেন। এমনকি কৈশোরকাল থেকেই নিজেই একজন আদ্যন্ত জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠেন মাদাম কামা। ভারতের নানা সংকটের বিষয়ে তিনি ছোটো থেকেই বিভিন্ন মহলে তর্ক-বিতর্ক করতেন।

১৮৮৫ সালের ৩ আগস্ট ধনী আইনজীবী রুস্তম কামার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। কিন্তু এই বিবাহ কখনোই রুস্তম কামা আর ভিকাজি কামার মানসিক দূরত্ব ঘোচাতে পারেনি। তারা উভয়ে মতাদর্শের দিক থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর। একদিকে রুস্তম কামা ব্রিটিশদের অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধাবনত চোখে দেখতেন, তাদের সমীহ করতেন আর অন্যদিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার কট্টর বিরোধী ছিলেন মাদাম কামা। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন একমাত্র ব্রিটিশদের সম্পদ লুণ্ঠন এবং ঔপনিবেশিক দখলদারির জন্যেই ভারত দূর্ভিক্ষপীড়িত, অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল হয়ে আছে। সেই সময় থেকেই জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি  জনকল্যাণমূলক কাজে এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে শুরু করেন। ১৮৯৬ সাল নাগাদ বম্বে প্রেসিডেন্সিতে প্লেগ মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়ে আর তখনই প্লেগ থেকে মানুষকে বাঁচাতে গ্র্যান্ট মেডিকেল কলেজের স্বেচ্ছাসেবী দলগুলির প্রথম সারির কর্মী হয়ে ওঠেন মাদাম কামা। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। নিজেই প্লেগ আক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু চিকিৎসার পরে সুস্থ হলেও দূর্বলতা সহজে কাটে না তাঁর। আরো ভালো চিকিৎসার জন্য ১৯০২ সালে লণ্ডনে পাড়ি দেন তিনি আর জীবনের বাকি সময় তিনি সেখানেই অতিবাহিত করেন।

মাদাম কামা ১৮৯৬ সালে বোম্বাই এলাকায় দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ আক্রান্ত হলে মেডিকেল কলেজের সেবামূলক কাজে যোগ দেন ও নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হন। স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে লন্ডন যান তিনি। ১৯০৮ সালে বিপ্লবী শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মা ও দাদাভাই নৌরোজি র সাথে তার আলাপ হয়। তিনি নৌরোজির ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। কামা হোমরুল আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকার তার এই কার্যকলাপ ভাল চোখে দেখেনি। দেশে ফেরার জন্য তাকে মুচলেকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় এই শর্তে যে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন এর সাথে নিজেকে সংযুক্ত রাখবেননা, কামা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। প্যারিসে গিয়ে তিনি প্যারিস ইন্ডিয়া সোসাইটি তৈরি করেন বিদেশে বসবাসস্থিত জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিদের সাথে। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট তিনি জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সমাজবাদী সম্মেলনে করেন। সেই সম্মেলনে ভারতের তিন রঙা পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের তীব্র সমালোচনা করেন মাদাম কামা। বিপ্লবীদের দমন পীড়ন নির্যাতন চালিয়ে বিপ্লবী কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য বিলাতে ভারত সচিবের একান্ত সচিব স্যার কার্জন উইলি সক্রিয় ছিলেন। ফলে শ্যামজি কৃশণবর্মার ঘনিষ্ট সহযোগী মদন লাল ধিংড়া কার্জন উইলিকে হত্যা করে বিপ্লবীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিশোধ নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লন্ডনে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিনায়ক দামোদর সাভারকরকে গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্য ভারতে পাঠানো হয়। পথিমধ্যে সাভারকর পালাবার চেষ্টা করেন ফ্রান্স উপকূলে। এসময় মাদাম কামার সাহায্য পাওয়ার সুযোগ তিমি পাননি। তাকে ধরে ব্রিটিশ পুলিশ। কামাকেও ফেরত পাঠানোর দাবী তোলে ইংল্যান্ড কিন্তু ফ্রান্স সরকার তা গ্রহণ না করায় শ্রীমতি কামার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। সোভিয়েত রাশিয়া থেকে রুশ বিপ্লবের নেতা লেনিন শ্রীমতি কামাকে আমন্ত্রন জানান তার দেশে আশ্রয় নেওয়ার জন্যে যদিও কামা সেখানে যেতে পারেননি।

ভারতের বাইরে জার্মানির স্টুটগার্টে প্রথম ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন মাদাম কামা (Madam Cama)। বীর সাভারকরের বিন্যাস করা তেরঙা সেই পতাকা যদিও আজকের ভারতের জাতীয় পতাকার থেকে পৃথক ছিল। ভারতের বাইরে বিপ্লববাদের প্রচেষ্টায় শ্যামজি কৃষ্ণবর্মা, সাভারকর, লালা হরদয়াল, দাদাভাই নওরোজি প্রমুখদের সঙ্গে তাঁর নামও মিশে আছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে।

১৯১০ সালে ইজিপ্টের কায়রো শহরে একটি সমাবেশে মাদাম কামা প্রথম লিঙ্গ সাম্যের কথা সোচ্চারে ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার যুদ্ধে পুরুষ এবং নারী প্রত্যেকেরই সমান অবদান থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। ১৯২০ সালে নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে দুই পার্সি নারী হেরাবাঈ এবং মিঠান টাটার সঙ্গে আলোচনায় বসেন মাদাম কামা এবং তাঁদের তিনি বোঝান যে ভারতে স্বাধীনতা এলে শুধু ভোটাধিকারের স্বাধীনতা নয়, বরং ভারতীয় নারীরা সকল প্রকার অধিকার পাবে। মাদাম কামার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ভীত হয়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ভারতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ৩৫ বছর ধরে টানা দেশের বাইরে থাকার পরে অসুস্থ শরীরে একটিবারের জন্য দেশে ফিরতে চান তিনি। অবশেষে ১৯৩৫ সালের নভেম্বর মাসে বম্বেতে তাঁকে নিয়ে আসা হয় এবং অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী ভিকাজী রুস্তম কামা ওরফে মাদাম কামা ১৯৩৬ সালের ১৩ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।