ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : ঠাকুরগাঁওয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে মাদক ব্যবসায়ীরা। অনেকটা প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা। বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাঝে-মধ্যে অভিযান চালালেও ঠেকানো যাচ্ছে না মাদকের বিস্তার। সীমান্তপথে আসা ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক পাচারকারীদের হাত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে খুবই সহজে। অথচ ঠাকুরগাঁওয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠলেও ডিবি পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এক্ষেত্রে অনেকটাই অসহায়। অপরদিকে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পুলিশের মাসোহারা নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো রকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এ অধিদপ্তর। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্যমতে, ঠাকুরগাঁও চারটি উপজেলায় সীমান্তবর্তী হওয়ায় মাদক চোরাচালানের নিরাপদ ‘রুট’। আর এখান থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের বিভিন্ন মহল্লা ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় বেশি মাদক কেনা বেচা হচ্ছে। গাঁজা ফেনসিডিল আসে ঠাকুরগাঁও সীমান্ত এলাকাগুলো হয়ে। এসব পাচারকারীর মূল টার্গেটই হচ্ছে যুব সমাজ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম হয়ে সড়ক পড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ইয়াবা আসছে। তবে এর নিয়ন্ত্রণ করছে ১০/১২ জন খুচরা বিক্রেতা। হঠাত্ বিভিন্ন অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী অনেককেই আটক করা হয়। উদ্ধার হয় কিছু পরিমাণ মাদকদ্রব্য। কিন্তু অভিযানে আটক হলেও পরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের তত্পরতায় এরা সহজইে বেরিয়ে এসে আবার সেই পুরনো ব্যবসায় ফিরে আসে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থিত জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। অফিস জনবল থাকলেও প্রয়োজনীয় যানবাহনও নেই, অভিযান পরিচালনার জন্য অস্ত্র বা পোশাকের যোগানও নেই এখানে।
এদিকে ঠাকুরগাঁও শহরের খালপাড়া, হঠাত্ বস্তি, নিশ্চিতপুর কলেজপাড়া, ঠাকুরগাঁও রোড রেল স্টেশন, জাগরণি ক্লাব, কলোনী ইয়াবা বিক্রির এই বিষয়টি এখন ওপেনসিক্রেট।
শুক্রবার রাতে শহরতলির খালপাড়া গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক ভ্রাম্যমাণ ইয়াবা বিক্রির দোকান খুলে বসেছে। ইয়াবা সেবনকারীদের জন্য ওই বাসায় একটি পাকা ঘর বানানো হয়েছে। পিংক কালারের সেই ঘরের ভিতর থেকে জানালা দিয়ে অপেক্ষমাণ কাস্টমারদের কাছে ইয়াবা বিক্রি করা হচ্ছে। তার নিজের শিশু সন্তানদেরও সে ইয়াবা দেওয়া-নেওয়ার কাজে লাগিয়েছে।
ক্রেতারা একজন একজন করে নির্ভয়ে সেখান থেকে ইয়াবা কিনে নিচ্ছেন। কেউবা ঘরের মেঝেতে বসে ইয়াবা সেবন করছেন। লাল রঙের প্রতিটি ইয়াবা ১৫০ টাকা আর বড় সাইজের গোপালি রঙের ৩৫০ টাকা করে বিক্রি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইয়াবা সেবনকারী জানান, এখানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার ইয়াবা বিক্রি হয়। খুচরা ক্রেতাদের পাশাপাশি পাইকারি ক্রেতারাও এখান থেকে ইয়াবা কিনে নেন। তিনি আরো জানান, ঠাকুরগাঁও শহর ছাড়াও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্পটে ইয়াবা বিক্রি হয়।
ঠাকুরগাঁও গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তারা বেশ কিছু মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে একা মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে।
ঠাকুরগাঁও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর ইসলাম বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জনবল সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। তা সত্ত্বেও যতটুকু সম্ভব আমরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। যানবাহনের অভাবে তাত্ক্ষণিক অপারেশন চালাতে পারছি না। মাদক ব্যবসায়ীরা ভয়ঙ্কর প্রকৃতির এবং অস্ত্রধারী। আর আমরা নিরস্ত্র। অস্ত্রবিহীন মাদক বহনকারী অস্ত্রধারীদেরও মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো অফিস ও জনবল পদায়ন না থাকায় মাদক অপরাধ দমন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের অন্যান্য বাহিনীর ঝুঁকি ভাতা, রেশন থাকলেও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের কর্মরতদের ক্ষেত্রে এর কোনো সুবিধা নেই।



