গৌরনদীর একটি জলাশয়ের মাছে অজ্ঞাত সংক্রমন

গৌরনদীর একটি জলাশয়ের মাছে অজ্ঞাত সংক্রমন

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি: গৌরনদীতে একটি মাছের খামারে অজ্ঞাত এবং নতুন ধরনের সংক্রমনের খবর পাওয়া গেছে। চাষের মাছে সিজনাল কিছু সংক্রমন হলেও এ সংক্রমনটি অজ্ঞাত। জোকের মত দেখতে একধরনের ব্যাকটেরিয়া চাষের প্রায় সব প্রজাতীর মাছকে আক্রমন করে মেরে ফেলছে, এর মধ্যে কাতল ও রুই জাতীয় মাছ বেশী সংক্রমিত হচ্ছে। ব্যাকটেরিয়াটি মাছের শরীরে সংক্রমন ঘটিয়ে বংশ বিস্তারও করছে। গৌরনদী উপজেলা উত্তর পালরদী এলাকায় একটি বড় জলাশয়ে এ সংক্রমন দেখা গেলেও অন্যকোন খামারে এ সংক্রমনের কথা শোনা যায়নি।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী এ উপজেলায় বছরে ৪ হাজার ১শ পাঁচ মেঃ টন মিঠা পানির মাছ উৎপাদন হয়। সফল মৎস্য চাষের উপর ভিত্তি করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখানে কয়েক হাজার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে আছেন। উপজেলার উত্তর পালরদী গ্রামে ৩শ শতকের জলাশয়টিতে অজ্ঞাত সংক্রমনে ৪৯ দিনে প্রায় ৫ লক্ষাধীক টাকার মাছ মরে গেছে । খামারিরা বললেন তারা প্রথম, এ রোগের সম্মূখিন হলেন এর আগে তারা কখনও এ ধরনের সংক্রমনের সম্মূখিন হননি।

স্থানীয়দের মতে জলাশয়টি শত বছরেরও বেশী পুরানো। বর্তমানে এটি ব্যক্তি মালিকানায় রয়েছে। জলাশয়টিতে ৫০ বছরের বেশী সময় বানিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছেন খামারীরা। জলাশয়টি থেকে প্রতিদিন দুই শতাধীক পরিবার তাদের দৈনন্দিন সাংসারিক কাজে মিঠা পনির চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। ঘটনাটি জানাজানি হলে খামারীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পরার আগে নতুন এ সংক্রমনের প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য সরকারিভাবে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার জোড় দাবী জানিয়েছেন এলাকার মাছচাষীরা ।

আজ বৃহস্পতিবার ভূক্তভোগি খামারি বাবু হাওলাদার জানান, তিনি ৪০ বছর মাছ চাষের সাথে গভীরভাবে জড়িত। তিনি এ সংক্রমন নতুন দেখেছেন। আগে কখনও তিনি এ ধরনের সংক্রমন দেখেননি। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারী প্রথম তার কাছে এ সংক্রমন ধরা পরে। প্রথমে তারা এটিকে এ্যাঙ্কর (একধরনের উকুনের মত ভাইরাস) জাতীয় সংক্রমন ভেবে এর প্রতিকারের জন্য প্রাথমিকভাবে কয়েক ধাপে বিভিন্ন মেডিসিন প্রয়োগ করেন। ১৫ দিন পরপর পর্যবেক্ষন করলেও এর ভয়াবহতা থামাতে পারেননি। সুমিথিয়ন নামে এক ধরনের কীটনাষকও ব্যবহার করেছেন। তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি ব্যা¬কটেরিয়াটি মাছের বহিরাংশে সংক্রমন কিছুটা কমলেও ভিতরে সংক্রমন ঘটতে থাকে। এমনকি এই সংক্রমনের জন্য তিনি মাছের ভাইরাস প্রতিরোধে শেষ ধাপের মেডিসিন প্রয়োগ করেও কোন সুফল পাননি।

তিনি আরো জানান আমরা মাছের চাষে যে ধরনের সংক্রমনের শিকার হই এগুলো সাধারনত এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মত এরা মাছের বহিরাংশে আক্রমন করে মাছকে ক্ষত করে। প্রাথমিকভাবে আমরা বিভিন্ন সংক্রমন প্রতিরোধক ব্যবহারের পাশাপাশি পানির সচ্ছতা ফেরাতে চুন,লবন ও পটাশ ব্যবহার করলে এ সংক্রমন থাকেনা। এতে মাছে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না এবং এটি সিজনাল।

কিন্তু নতুন এ সংক্রমনের ভয়াবহতা ভিন্ন এরা দেখতে জোক আকৃতির মূখের অংশে সুখ¥ লোমের মত হুল আছে। এ ভাইরাসটি মাছের আঁশের ভিতর দিয়ে মাছের মাংসের ভিতর খুব অল্প সময়ে প্রবেশ করে।রক্ত ও মাংস খেয়ে মাছের দেহে গভীর পচনের সৃষ্টি করে। একেকটি মাছকে ১০ থেকে ১২টি ওই ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রমন করে সংক্রমন ঘটিয়ে নিমিষেই মাছ মেরে ফেলে। সংক্রমনটি সব প্রজাতির মাছকে আক্রমন করছে। বেশী আক্রমন করছে কাতল ও রুই মাছকে। সংক্রমনে ৪৯ দিনে পাঁচ লক্ষ্য টাকার বেশী বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মারা গেছে।

কামাল হোসেন আকন নামে একজন এলাকাবাসী বলেন, মাছের খামারে নিয়ন্ত্রনহীনভাবে বিষাক্ত মুরগির বর্জ,রাসায়নিক,কেমিক্যাল এমনকি এ্যান্টিবায়োটিক পর্যন্ত প্রয়োগ করা হচ্ছে। দ্রুত লাভবান হওয়ার জন্য। মাছ চাষের পুকুর প্রস্তত থেকে রেনু উৎপাদন,রেনু নাসিং,চাষের জন্য পোনা অবমুক্তকরন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত, চাষের কয়েকটি ধাপে অন্তত ৩০ বার এ সব প্রয়োগ করা হয়। এর ভয়াবহতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পকেসচেতনতা নেই। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিষয়টি গভীরে দেখা উচিত ।

মাছের হ্যাচারির অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান মোজাফফর হোসেন জানান, সংক্রমনের ধরনটি নতুন দেখা যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে এই সংক্রমনের রহস্য উদঘাঁটন করে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিলে আমরা চাষীরা লাভবান হব।

ইয়ন একুয়া কালচার লিমিটেডের স্থানীয় প্রতিনিধি মোঃ আছাদুল শেখ জানান,ঘটনাটি শুনে আমি সরেজমিনে যাই, মাছ ধরে পরিক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি। নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় আমাদের কোম্পানির গবেষনা টিমের কাছে পাঠিয়েছি। এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমন প্রথম বলে মনে হচ্ছে।

গৌরনদী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আবুল বাশার এ প্রতিনিধিকে জানান, সংক্রমনের ধরন শুনে এটা নতুন কোন সংক্রমন মনে হচ্ছে। ঘটনাটি আমি (বুধবার ) শুনেছি,আমি সরেজমিনে যাবো এবং এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেব। তিনি এ বিষয়ে কাউকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।