উগ্রচণ্ডী রূপে দেবীর বিশেষ পুজো সন্ধিপূজা

প্রসেনজিৎ ঠাকুরঃ  সন্ধিপুজো মা দুর্গার আরাধনার এক বিশেষ মুহূর্ত। সন্ধি মানে মিলন। এই মুহূর্তটি হল অষ্টমী তিথি ও নবমী তিথির মিলন। মহাসন্ধিক্ষণ। অষ্টমী তিথির শেষ চব্বিশ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম চব্বিশ মিনিট মিলিয়ে মোট আটচল্লিশ মিনিট। এই সন্ধিক্ষণেই দেবী জেগে উঠে উগ্রচণ্ডী রূপ ধারণ করেছিলেন। তাই এই সময় দেবীর বিশেষ পুজো।

অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির জয়ের জন্য আরাধনা৷ পুরাণে আছে, ব্রহ্মার নির্দেশানুসারে শ্রীরামচন্দ্র দেবীপূজার আয়োজন করলেন। কিন্তু দেবী কি তখন জাগ্রত না নিদ্রিত? দেবী কি এখন আবির্ভূত হতে প্রস্তুত। তাই ধ্যানে খোঁজ নিলেন যে দেবী এখন কোথায় আছেন? ধ্যানমানসে উদ্ভাসিত হলেন দেবী এবং জানতে পারলেন যে, দেবী তখন কুমারীরূপে শায়িত আছেন বিল্বশাখায়।

স্রষ্টা ব্রহ্মার নির্দেশ অনু্যায়ী শ্রীরামচন্দ্র শুক্লা ষষ্ঠীর সকালে কল্পারম্ভ এবং সন্ধ্যায় বিল্ব বৃক্ষমূলে শুরু করলেন দেবীর বোধন। ষষ্ঠীতে বোধিত হলেন দেবী। সপ্তমীতে ষোড়শোপচারে দেবীকে পূজা করলেন শ্রীরামচন্দ্র; কিন্তু তখন পর্যন্ত দেবীর কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। তখন অষ্টমী তিথিতে সকল যোগিনীদের ডেকে আবার সমস্ত পূজা-অর্চনা করে আরাধনা করা হল দেবীকে। দেবী তখনও কোন সাড়া দিলেন না। আগত যোগিনীদের হৈ-চৈ-তে দেবী তখন কেবল একটু নড়ে চড়ে পাশ ফিরে শয়ন করলেন। কিন্তু জাগ্রত হলেন না। তখন অষ্টমীর শেষ এবং নবমীর শুরুতে মহা সন্ধিক্ষণে করলেন দেবীর আবার বিশেষ পূজা। যাকে বলা হয় সন্ধিপূজা। অষ্টমীর ২৪ মিনিট এবং নবমীর ২৪ মিনিট নিয়ে মোট ৪৮ মিনিটের পূজা হল সন্ধিপূজা। সন্ধিপূজা হল দেবী চামুন্ডার বিশেষ পূজা।

শ্রীরামচন্দ্র তখন চামুন্ডা দেবীকে আবাহন করে বললেন-যেভাবেই হোক দেবী দুর্গাকে জাগাতে হবে। চামুন্ডার সহযোগীতায় দেবী তখন জেগে উঠলেন নবমী তিথিতে। শ্রীরামচন্দ্র দেবীকে যোগিনীদের সঙ্গে বিশেষ পূজা করলেন এবং দেবীকে দর্শন করলেন কুমারীরূপে। সেই থেকে কুমারীরূপী দেবীপূজা শুরু। শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গাকে একসঙ্গে একশ আটটি নীলপদ্ম অঞ্জলি দিলেন এং দেবী নবমীর দিন কুমারীরূপে পূজিতা হলেন। অ-বাঙালিরা হয়ত এই জন্য নবমীর দিনটাকে বিশেষভাবে মান্য করে। সন্ধিপূজার বিভিন্ন নিয়ম এবং প্রথাঃ মা দুর্গার আরেক রূপ হল মহিষাসুর-মর্দিনী। মহিষাসুর মর্দিনী অর্থাৎ তিনি এই অসুরের নিধন করেছিলেন। কিন্তু দুর্গা পুজোর পিছনে আরো অসুরবধের কাহিনী আছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ধিপূজা। অষ্টমী শেষ হয়ে যখন নবমী তিথি শুরু হয়ে তখন সন্ধিপূজার মাধ্যমে মায়ের আরাধনা করা হয়। এই সন্ধিপূজা হল সেই সন্ধ্যার প্রতীক যখন মা দুর্গা চন্ড ও মুন্ড নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুরকে বধ করেছিলেন। সন্ধিক্ষণ কখন? অষ্টমী তিথি শেষ হয়ে যাওয়ার শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথি শুরু হওয়ার প্রথম ২৪ মিনিটকে বলা হয় সন্ধিক্ষণ । ঠিক এই সময়েই দেবী দুর্গা চন্ড ও মুন্ড নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুরের নিধন করেছিলেন। এই ঘটনাটি মনে রাখার জন্যই প্রতি বছর অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে এই সন্ধিপূজা করা হয়।

চান্দ্রমাস ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই সময়টি প্রতিবছরই পরিবর্তিত হতে থাকে। কোনো বছর এই সন্ধিক্ষণ রাত ৮টাতেও হতে পারে আবার কোনো বছর ভোররাতেও হতে পারে। সেই সময় দেবীর গাত্রবর্ণ বা গায়ের রঙ ছিল স্বর্ণাভ বা সোনালী এবং তিনি হলুদ শাড়ি পরে অবতীর্ণ হন। তাঁর দশ হাত সজ্জিত ছিল দশ ধরণের অস্ত্রে। যখন মহিষাসুরের সঙ্গে ভয়ানক যুদ্ধে তিনি ব্যস্ত, সেইসময় মহিষাসুরের দুই বন্ধু চন্ড এবং মুন্ড পিছন থেকে দেবীকে আক্রমণ করে। রণনীতির চুক্তি ভঙ্গ হওয়ায় দেবী অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হন এবং রাগে তাঁর মুখ নীল হয়ে যায়। দেবী তাঁর ত্রিনয়ন উন্মীলিত করেন এবং চামুন্ডা রূপ ধারণ করেন। ঘনীভূত রক্তের কালীরই অন্য রূপ হল চামুন্ডা রূপ। চামুন্ডা রূপে দেবী দুর্গা চন্ড এবং মুন্ডের মাথা কেটে নেন তাঁর হাতের খড়গ দিয়ে। দেবীর এই চামুন্ডারূপেরই আরাধনা করা হয় সন্ধি পূজার মাধ্যমে।

সন্ধিপূজার নৈবেদ্য নবমীর পুজোই মাকে নৈবেদ্য দেওয়ার শেষ সুযোগ। তাই সন্ধিপূজার আয়োজনও সাড়ম্বরে করা হয়। সন্ধিপূজায় দেওয়া হয় ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। নৈবেদ্যয় দেওয়া হয় গোটা ফল (লাল রঙের ফল থাকা বাঞ্ছনীয়), জবা ফুল, শাড়ি, সাদা চাল, গহনা (যদি দিতে চান) এবং বেলপাতা। প্রতিটি পারিবারিক পুজোয় এবং বারোয়ারি পুজোয় যে যার নিজের মত করে সাজিয়ে দেন ই নৈবেদ্যগুলি, কিন্তু ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নিয়মটি কিন্তু চিরাচরিত, এর কোনো অন্যথা হয় না ।

সন্ধিপূজার বিভিন্ন আচার-নিয়ম এবং প্রথা সন্ধিপূজার সঙ্গে নানারকম আচার এবং প্রথা জড়িয়ে আছে। রাজপরিবার এবং জমিদারপরিবারের দুর্গা পুজোয় সন্ধিপূজার সময়ে কামান দেগে তোপধ্বনি করা হত, অনেক জায়গায় সন্ধিপূজার সময় ঢাক বাজানো হত। এমনকি আজকের দিনেও সন্ধিপূজার সময়ে সবাই একটু ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, কারণ এই পুজোই মায়ের প্রধান পুজো, তাই কেউই এই পুজোর আয়োজনে কোনো ফাঁক রাখতে চান না। দুর্গোৎসব হল ব্রহ্মান্ডব্যাপী মাতৃশক্তির আরাধনা, অশুভশক্তির বিনাশ করে শুভশক্তির জয়। দুর্গাপূজায় এই সন্ধিক্ষণের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।পুরাণ অনুসারে, অসুরদের সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধের সময়ে দেবী অম্বিকার কপালে থাকা তৃতীয় নেত্র থেকে দেবী কালিকা প্রকট হয়েছিলেন ঠিক এই সময়কালে।

আবার অন্যত্র এমনটাও বলা হয়েছে যে, পরাক্রমী অসুর রক্তবীজের সমস্ত রক্ত এই সন্ধি মুহূর্তেই দেবী চামুণ্ডা কালিকা খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই পণ্ডিতেরা বলে থাকেন, এই সন্ধিক্ষণ চলাকালীন সময়ে মা দুর্গার অন্তর থেকে সমস্ত স্নেহ, মমতা অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই কারণেই সন্ধি পূজার সময়ে দেবীর দৃষ্টি পথ পরিষ্কার রাখা হয়, চামুণ্ডা দুর্গার চোখের সামনে দাঁড়াতে নেই। অনেক জায়গায় এই সন্ধিপূজা তে বলি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। বহু জায়গায় ছাগ বলি হয়ে থাকলেও কলা, আঁখ, চালকুমড়ো ইত্যাদিও বলি দেওয়া যায়। বলি দান অষ্টমী তিথিতে নয়, সন্ধি পূজার প্রথম দণ্ড অর্থাৎ ২৪ মিনিট পার হওয়ার পরেই হয়।

শাস্ত্রে এই সন্ধি পূজার অনেক মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে। সংযমী হয়ে উপবাসী থেকে সন্ধিব্রত পালন করলে নাকি যমদুখ থেকে মুক্তি মেলে। অর্থাৎ মৃত্যুর সময়ে মায়ের কৃপা লাভে যম স্পর্শ করতে পারে না। এমনও বলা হয় যে, ভক্তিভরে সন্ধি পূজায় যোগ দিলে সারা বছর দুর্গাপূজা না করেই সেই ফল লাভ করা যায়। বিভীষণ বিধান দিয়েছিলেন ১০৮টি লালপদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনা করলে দুর্গা প্রসন্না হবেন। কিন্তু পুজোর সময়ে রামচন্দ্র দেখেন একটি ফুল কম। সেই সময়ে তির-ধনুক তুলে নিজের একটি চোখ উপড়ে ফেলতে চান দশরথনন্দন। যদিও গোটাটাই ছিল মহামায়ার ছলনা। রামের ভক্তি দেখে দেবী নিজে আবির্ভূত হন। সেই ঘটনার থেকেই সন্ধি পুজোর সময়ে দেবীকে ১০৮টি পদ্ম নিবেদন করা হয়। সমসংখ্যাক প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়।’

পণ্ডিতরা তাই এমনও বলেন যে, সন্ধি পুজোর সময়েই দেবী মহামায়া মৃন্ময়ী মূর্তি থেকে চিন্ময়ী রূপে আসেন ও ভক্তের পূজা গ্রহণ করেন। ১০৮ প্রদীপ জ্বেলে প্রার্থনা করতে হয় যাতে দেবী সংসারের সব আঁধার মোচন করেন। দেবী যেন জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।