গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরুর ছয় মাসেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়েছে বিএনপি সরকার। এর মধ্যে ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ইমাম, পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্টসংখ্যক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের এই সুবিধা দেওয়া হলেও ধাপে ধাপে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। ধর্মীয় চিন্তাবিদদের মতে, উপাসনালয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভাতার পরিমাণও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি থেকে পাইলট প্রকল্প
নির্বাচনী ইশতেহারে ইমাম, পুরোহিত, ধর্মযাজকসহ বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়ে কর্মরতদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি।
সরকার গঠনের প্রায় এক মাস পর মার্চে এই কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৬ হাজার ১৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত ও ধর্মযাজকসহ মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে সম্মানী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে।
উপকারভোগীদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি
ভাতা পাওয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বলছেন, নিয়মিত এই অর্থ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি এনেছে।
একজন ইমামের ভাষ্য, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সরকারের এই উদ্যোগ তাদের সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতিও দিয়েছে। ভাতা পাওয়ায় সীমিত আয়ের মধ্যে সংসারের ব্যয় সামলানো তুলনামূলক সহজ হচ্ছে।
আরেকজন ইমাম জানান, তিনি ইতোমধ্যে চার মাসের ভাতা পেয়েছেন। তার মতে, এই অর্থ পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত করতে সহায়তা করছে।
একজন পুরোহিত বলেন, মন্দিরে পূজা-অর্চনা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন ছিল। সরকারি সম্মানী পাওয়ার ফলে এখন সন্তানদের নিয়ে সংসার পরিচালনা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে।
বড় পরিসরে নেওয়ার পরিকল্পনা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ধর্মীয় কর্মীদের সম্মানী ভাতা কর্মসূচি আরও বড় পরিসরে নেওয়া হবে।
এই পর্যায়ে ৮৬ হাজার ৭০৯টি মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী আড়াই লাখের বেশি ইমাম, পুরোহিত ও ধর্মযাজক সুবিধা পেতে পারেন।
তবে পরিকল্পনা থাকলেও এখনো অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মী এই সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
একজন আবেদনকারী অভিযোগ করেন, কয়েক দফায় আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ভাতা পাননি। ফলে কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করার দাবি উঠেছে।
আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতাও বাড়ানোর দাবি
ধর্মীয় চিন্তাবিদরা মনে করছেন, উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি সম্মানী চালু করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠানকে কর্মসূচির আওতায় আনলেই হবে না, সময়ের সঙ্গে ভাতার পরিমাণও বাড়ানো প্রয়োজন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের গভর্নর ড. মুফতি খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এ কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩ হাজারের বেশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধরও কর্মসূচি চালুর বিষয়টিকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, এই উদ্যোগের পরিধি আরও বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি শুধু পুরোহিতদের আর্থিক সহায়তা নয়, মন্দির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণেও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সেখানে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে কর্মসূচির আওতায় আনা গেলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ভাতা প্রদান, আবেদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ভাতার পরিমাণ সময়োপযোগী করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।



