বগুড়া প্রতিনিধি: আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স(এ্যালিকো) কোম্পানীর মাঠ কর্মী সহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র মরণাপন্ন রোগীকে সুস্থ দেখিয়ে কোটি টাকার ইন্সুরেন্স(পলিসি) করিয়ে দিয়েছেন। গ্রাহক নিজে পলিসির টাকা জমা না দিলেও পরপর কয়েকটি পলিসির কিস্তি দেয় সংঘবদ্ধ চক্র।
কিছুদিন পর পলিশি হোল্ডার সেই অসুস্থ লোকটি মারা যায়। এর পর থেকেই কোটি টাকার বীমা দাবির অর্থ উত্তোলনের সব প্রস্তুতিও এগিয়ে নেয় ওই চক্র। এমনকি কোম্পানীর তদন্ত টিমকে বিভ্রান্ত করতে লক্ষাধিক টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা লোকদের রাস্তায় বসিয়ে রাখা হয়, তদন্তকারি টিমটি তাদের পরিকল্পনায় কোন বাগড়া দিতে পারেনি। বীমা দাবির অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টায় নিখুঁত পরিকল্পনায় ভেস্তে দিতে সক্রিয় হয়ে উঠে এলাকার কতিপয় সচেতন নাগরিক। ফাঁস হয়ে গেছে ওই সংঘবদ্ধ চক্রের সাজানো গোপন পরিকল্পনা। এমনি এক ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শুভগাছা গ্রামে।
অভিযোগ ও এলাকাবাসি সুত্রে জানা যায়, বগুড়ার শেরপুরে আমেরিকান লাইফ ইন্সুরেন্স (এ্যালিকো) কোম্পানীর মাঠকর্মী শাহীনা আকতার তুবার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র অসুস্থ্য রোগীকে গ্রাহককে ১ কোটি টাকার ইন্সুরেন্স করিয়ে দেন। ওই ইন্সুরেন্সের বীমা পলিসি’র কিস্তির টাকা পরিশোধ করতেন ওই চক্রের সদস্যরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের মৃত নাছির উদ্দিনের ছেলে গ্রাহক রফিকুল ইসলাম মন্ডল মিঠু (গ্রাহক আইডি নং বিডি-৩৭৩২০৩৬) সে দীর্ঘদিন যাবত কিডনি ড্যামেজ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে ওই বীমা কোম্পানীর মাঠ কর্মী শাহীনা আকতার তুবা অবগত হওয়ার পরও অফিস সহকারি আবু তাহেরকে ম্যানেজ করে অসুস্থ মানুষকে সুস্থ্য দেখিয়ে কমিশনের লোভে তাকে বীমা গ্রাহক সদস্য বানিয়ে নেয়। ইতিপূর্বে একই কায়দায় রফিকুলের অসুস্থ ভগ্নিপতি উপজেলার শুভগাছা গ্রামের মৃত ময়েজ উদ্দিনের ছেলে অসুস্থ সোহরাব হোসেনকে বীমা গ্রাহক করিয়ে দিয়েছিল। বীমা গ্রাহক সোহরাবের মৃত্যুর পর সেই টাকা উত্তোলন করে সকলেই ভাগবাটোয়ারা করে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমন লোভে পুনরায় একই কায়দায় মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা হিসেবে রফিকুলের পরিবারের সাথে ওই চক্রের চুক্তি হয় এবং কোটি টাকার বীমা গ্রাহক বানায়। ফলে বীমা গ্রাহকের মৃত্যু হলে দাবীকৃত বীমার অনুকুলে যে টাকা উত্তোলন করা হবে তার কিছু অংশ পরিবারকে দেয়া হবে। এদিকে মরণব্যাধিতে গ্রাহক রফিকুল ইসলামের মৃত্যু হলে টাকা তুলতে সব চেষ্টা অব্যাহত রাখে ওই চক্রটি। অসুস্থতার বিষয়টি গোপন রাখতে স্থানীয় কার্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে মোটা অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে অসুস্থ্য গ্রাহককে সুস্থ দেখে কিভাবে ইন্সুরেন্স গ্রাহক সৃষ্টি করে তা নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে অন্যান্য গ্রাহকদের মাঝে। কোটি টাকা হাতিয়ে অপচেষ্টাকারী চক্রের ষড়যন্ত্রের গোমর ফাঁস হলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ওই চক্রটি মোটা অংকের টাকা নিয়ে ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় নেমেছে।
অভিযোগকারী মিট লাইফ এ্যালিকো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর সচেতন গ্রাহক মোজাহিদুল ইসলাম পারভেজ বলেন, একজন নিরপেক্ষ কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত করতে দিলে সংশ্লিস্ট কোম্পানী মাঠকর্মী শাহীন আকতার তুবার অপকর্ম উম্মোচন হবে।
সরেজমিনে উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের সরোয়ার মেম্বারের ছেলে রকিবুল হাসান রুবেল জানান, তার মামা(রফিকুল ইসলাম মন্ডল মিঠু)’র নামে কোটি টাকার ইন্সুরেন্স করা আছে। দাবীকৃত বীমা পলিসির ৯ থেকে ১০টি কিস্তি দেয়ার পর তিনি মারা গেছেন, এখন ওই টাকা তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মৃত মামার নামে ৪ থেকে ৫ বিঘা জমি আছে, পার্টনারে ডিলারশিপের ব্যবসা করতেন, মৃত্যুকালে ২, মেয়ে ও স্ত্রী রেখে গেছেন বলে তিনি জানান। অন্য এক প্রসঙ্গে ওই বীমা গ্রাহক অসুস্থ ছিল কিনা এবং তার আয় থেকে কোটি টাকার ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম(পলিসি) চালানো স্বাভাবিক ছিল কিনা সাংবাদিকরা এমন প্রশ্নে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
এছাড়াও ওই বীমা গ্রাহকের গ্রামের বাড়ীর অবস্থা ও সাংসারিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কোটি টাকার ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম চালানো নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান বলে একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে আমেরিকান লাইফ ইন্সুরেন্স (এ্যালিকো) কোম্পানীর সংশ্লিস্ট মাঠকর্মী শাহীনা আকতার তুবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি এর সাথে জড়িত নন। ওই বীমা গ্রাহক পূর্বে অসুস্থ ছিলেন বলে তিনি বিষয়টি অবগত ছিলেননা। তবে এখন আর ওই বীমাদাবিকৃত টাকা উত্তোলন সম্ভব নয় বলে তিনি দাবী করেন।
মতামত জানতে আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স(এ্যালিকো)’র বগুড়ার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মোস্তাক আহম্মেদ পাটোয়ারির মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তাদের জানা ছিলনা ওই বীমা পলিসি হোল্ডার পুর্ব হতে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। ইন্তেকালের পর বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠার পর কোম্পানী আবারো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন। এখানে আমার বা অন্যকারো কিছুই করার সুযোগ নেই।

