শেখর রায়
৬ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ কলকাতা ব্রিগেড প্যারেড ময়দান। সাত সকাল থেকে আমরা ছেলেরা হাজির মঞ্চের সামনের সারিতে। আমার বয়স তখন মাত্র ১৬ বৎসর, পরনে সেনা শিক্ষার্থীর পোশাক। ন্যাশনাল ক্যাডেট করপ। আমাদের দায়িত্ব মঞ্চ ঘিরে থাকা। কারন আমাদের জাতীয় নেতা নেত্রীরা মঞ্চে থাকবেন। থাকবেন তদানীন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আর বঙ্গজাতির অতি প্রিয় অবিভাবক শেখ মুজিবর রহমান।
দশ লক্ষ মানুষের সভা শুরুতে পাকিস্থানী সেনা ও ইসলামী রাজাকার গুণ্ডাদের মিলিত হত্যাকাণ্ডের শিকার ত্রিশ লক্ষ হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধদের মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শ্রীমতী গান্ধী আহ্বান করলেন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। বংগবন্ধু মাইকের সামনে দাঁড়াতে জয়বাংলা জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠলো মানুষ। কেউ যেন থামে না। শ্রীমতী গান্ধী হাত দিয়ে সকলকে শান্ত হয়ে থাকো বলতে মানুষ থামল। কি যে উত্তেজনাময় ঐ সেদিনের ব্রিগেড সভা ছিল তা বলে বোঝাতে পারব না। উত্তেজনাতে আমিও ছিলাম সমান কম্পমান। কারন আমিও সেই প্রথম এত কাছ থেকে প্রিয় নেতাকে দেখলাম। সীমান্ত পাড়ে ময়দানি মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন না, তিনি ছিলেন পাকিস্তান জেলে। আমরা তাঁর স্মৃতিটুকু বুকে বয়ে লড়ে গেছি। আর আমাদের মত খুদে সেপাইদের বুকে আগুন লাগিয়েছিলেন প্রিয় বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন, টাইগার সিদ্দিকী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা। কে আর তাদের মনে রাখে। কিন্তু ভোলা গেল না বঙ্গবন্ধুকে। তাঁর সেই অনন্যসাধারান বাগ্মিতা, তাঁর উদ্দিপক বজ্রকণ্ঠে দৃপ্ত ভাষণ।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে ঘোষণা দিলেন যে স্বাধীন বাংলাদেশ চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে। বাঙালি জাতিয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। তিনি সরাসরি ইসলামের নামে বাঙালি জাতিকে ধংস করার বিরুদ্ধে সতর্ক করে ইতিহাস স্মরণ করালেন। বললেন, ওরা বলত যে ‘এসলাম বিপন্ন, এসলামের শত্রুদের ধংস কর’। বঙ্গবন্ধু ব্যাঙ্গ করে ইসলামকে এসলাম বলতেন। ‘আরে আমার বাঙ্গালীদের পেটে ভাত দিতে পারেনা, আবার ধর্ম’। ‘ওরা (পাক সেনা ও ইসলামী জামাত রাজাকার জোট) আমার বাংলার গ্রাম শহর সব কিছু ধংস করে দিয়েছে। আমার লাখে লাখে মা বোনকে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে গণ হত্যা করেছে। লাখে লাখে নিরস্ত্র নিরীহ হিন্দু মুসলমানের খুনে বাংলাদেশের নদী মাঠ রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছে। আর এই গনহত্যাকারিদের মদত জুগিয়েছিল আমাদের শত্রুদেশগুলি ও আমেরিকা সহ পাকিস্থানের বন্ধুদেশগুলি। বিপরীতে প্রকৃত বিপদের বন্ধু হিসাবে পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। তাই আপনারা বলেন, জয় ভারত’। সভার মানুষ লক্ষ কণ্ঠে তাঁর সাথে গলা মেলালেন। দশ লক্ষ কণ্ঠে আকাশ বিদীর্ণ হোল, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা।
আমি নেতাজী সুভাষকে দেখিনি। দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে। দেখেছি রাষ্ট্রনেতা (The Statesman) কাকে বলে। সভামঞ্চ থেকে সিঁড়ী দিয়ে নামতে আমার কাঁধে ভর দিয়ে মাটিতে রাখলেন পা। আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। আমি আর বলতে পারছিনা। আমার চোখ ভাসে অশ্রুতে…………। ক্ষমা করবেন।
তিনিই এই বিভক্ত দুই বঙ্গের একচ্ছত্র নেতা হয়ে উঠেছিলেন। যদি তখন ঢাকা থেকে ডাক দিতেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীদের যে আয় তোরা, সীমান্ত বেড়া ভেঙ্গে আমার কাছে চলে আয়। মানুষ তাই করতেন আমার বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড অন্ধকারাচ্ছন্ন বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দিল আবার। আজ সেই একভাবে ইসলামের নামে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের রক্তে রক্তাক্ত করছে বাংলাদেশ। প্রানভয়ে নিজ ভিটামাটি ছেড়ে দুঃসহ জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে লাখ লাখ অমুসলমান বাংলাদেশী শরণার্থী। একটি পথভ্রষ্ট জাতি সম্পূর্ণভাবে তাঁর জনকের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অধিকাংশ বঙ্গভাষী নিজেদের আগে মুসলমান ও পরে ভাবে আমরা বাংলাদেশী। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি নিছক শহুরে কালচারে এসে ঠেকেছে। তাকে গ্রাম পর্যন্ত ব্যাপ্ত করার কোন প্রচেষ্টা নেই। বিপরীতে গ্রামে গ্রামে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণের জোরদার কার্যকলাপ চলছে আর অন্যদিকে সর্বত্র হিন্দু বৌদ্ধ দেবালয় আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে শরীয়তী শাসনের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা হলে যেন বিশ্ব জয় করে ফেলবে মোল্লারা। চলবে ফতোয়ার পর ফতোয়া। স্বধর্মের নারী শুধু ভোগের বস্তু আর বিধর্মী নারী গণিমতের মাল। বলে, ‘হারিয়েছি আমরা পাকিস্তান,এবার বাংলা হবে আফগানিস্তান’।
বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবন ও কর্ম আজো যে কোন সমাজ বিজ্ঞানের গবেষকের কাছে তাৎপর্য বহন করে চলেছে। তিনি সেই ব্যাক্তি যিনি খুব কাছে থেকে গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং এর কুখ্যাত নায়ক সোরাবর্দিকে মেপেছিলেন, দেখেছেন পাকিস্থানের অন্যতম রুপকার ফজলুর হককে। তিনি দেখেছেন বীভৎস নোয়াখালী, ঢাকা, রাজশাহী, ময়মন্সিঙ্গের সাম্প্রদায়িক হিন্দুহত্যাকাণ্ড। তিনি মনে মনে এই পরিতাপে দগ্ধ হয়েছেন যে এই হিন্দু মুসলমান বিভাজন করে একটি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে চলেছে। তিনি ভিতরে ভিতরে পরিত্রাণের রাস্তা খুজছিলেন। তাঁর সেই স্বাধীন যাত্রা পথের সুচনা হয় আওয়ামি মুসলিম লীগের নাম বদল করে শুধু আওয়ামি লীগ দল তৈরি করে যেখানে সব ধর্ম বর্ণের মানুষ অংশ গ্রহন করে বাঙালি জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে রূপান্তর করতে পারবেন। তিনি পারবেন ঐ কট্টর মোল্লাতন্ত্রকে কোণঠাসা করে বাঙালি জাতির অন্ন বস্ত্র বাসস্থান তার ভাষা সংস্কৃতির দাবীকে সাধারন জনগণের সামনে নিয়ে আসতে। তিনি সেই দাবীগুলির রাজনৈতিক পরিভাষা খুঁজছিলেন। তিনি পেলেন, কারন তার সামনে ছিল ১৯৫২ পরে ধারাবাহিক বাংলা ভাষা সংস্কৃতির জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দলনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার রাজনৈতিক আদর্শ বাংলাদেশের মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধখ্রিস্টান আদিবাসী সহ সমগ্র জনগণ সানন্দে গ্রহন করে তাকে পাকিস্তানের সাধারন নির্বাচনে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলেন। তার এমন রাজনৈতিক সততা ও নিষ্ঠা ছিল যে তার নেতৃত্তের প্রতি ও আওয়ামী লীগ দলকে মানুষ সার্বিক সমর্থন জানালো। তার দলকে কোথাও ভোট জালিয়াতি করে জিততে হয়নি। যদিও সেই নির্বাচনী বিজয়কে মানল না পাকিস্থানের সেনা কবলিত শাসনতন্ত্র। তাকে জেল বন্দী করে বাংলাদেশে ইতিহাসের ভয়ংকরতম গনহত্যা সংগঠিত করে বিশ্বে জঘন্য নজির সৃষ্টি করলো।
ইতিহাস তবু কোথাও থেমে থাকেনি। অদম্য বাঙালি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠল। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে শুরু হোল নয় মাসব্যাপি মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরের শেষের মাসে পাকিস্থান আচমকা ভারত আক্রমন করার ফলে ভারত যুদ্ধে নেমে এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ দখল করে নিল ও এক লাখ পাক সেনা বন্দী করে নিয়ে চলে গেল ও শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্তে আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে বাংলাদেশের ভার দিয়ে গেল।
‘বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে ছাড়ব আমি’। বঙ্গবন্ধুর কলকাতার এই ব্রিগেড ভাষন শোনার পর পুঁজিবাদের রক্ষক আমেরিকা কি চুপ করে বসে থাকে! তারা বেইমান বাংলাদেশী খুঁজে পেয়ে গেল। সেনাদের এক বিরাট অংশকে বিশাল টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট শেষরাত ৩-৩০মিঃএ পরিবার সহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করলো। শুনেছি এই খবর শুনে ইন্দিরা গান্ধী কেঁদে ফেলেছিলেন। আক্ষেপ করেছিলেন যে শেখ মুজিব তার সাবধান হবার পরামর্শ কানে তোলেননি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘না ইন্দিরা, কি বলছো তুমি? আমাকে মারবে বাংলাদেশের মানুষ? আমি বিশ্বাস করিনা’। তাই হোল। তাকে হত্যা করলো তার স্বধর্মের মানুষ। যেমন ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে দেখা গিয়েছিলো ।
তবু বাংলাদেশে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী শাসকবর্গের আজো শিক্ষা হোল না। যে মানুষ ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে সারা জীবন সংগ্রাম করে পরিবার সহ নিজেকে হারিয়ে এক স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠন করে গেলেন, দিয়ে গেলেন তার মাতৃভাষা বাংলা, তাকে মানুষ সহজেই কার্যতঃ ভুলে গেল। তারা সেনাশাসনে করা অবৈধ সংবিধান সংশোধনকে সানন্দে রেখে দিল, ‘ বিশমিল্লা রহিম এ রহিম’। বাংলাদেশ এক আত্মবিস্মৃত ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বে নিজেকে পরিচয় দিল। আজো তার ছয়জন হত্যাকারি বিদেশে পালিয়ে, তাদের ধরা গেল না। বঙ্গবন্ধুর নশ্বর আত্মা আজো মুক্তি পেল না।
*The writer is the Chief Advisory Editor, www.thenews.com



