ভূমিকম্প হলেই বৈঠক

ডেস্ক রিপোর্ট: ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো সমন্বিত সুপারিশ প্রণয়ন হয়নি আদালতের নির্দেশের সাত বছর পরও। রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ-সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠিত হলেও এত দিনে বৈঠক হয়েছে মাত্র গোটা চারেক। দেশে ভূমিকম্প হলেই বৈঠকে বসে কমিটি।

সোমবার ভোর রাতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর দুপুরের দিকে সচিবালয়ে বৈঠক হয়েছে, সেখানেও সমন্বিত সুপারিশ প্রণয়নের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, সেখানে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কিছু সরঞ্জাম কেনাসহ অন্যান্য বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জাল হোসেন চৌধুরী মায়া বৈঠকে বলেন, “আদালত যখন রায় দিয়েছে, তখন আমি মন্ত্রী ছিলাম না। তার পরও আদালতের রায়ের বাইরে আমরা অনেক কাজ করেছি। হয়তো সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়নি, কিন্তু কাজ থেমে নেই।” ভূমিকম্প মোকাবিলায় অনেক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির এক সদস্য বলেন, “হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার আলোকে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একাধিক বৈঠক করার দরকার ছিল। কয়েকটি উপকমিটি গঠন করে মূল কমিটিকে আরো কার্যকর করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেসব কিছুই হয়নি। যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সমন্বিত সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।”

একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৯ সালে সরকারকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ‘ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধিবিষয়ক কমিটি’ করার নির্দেশ দেন। এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ৩৯ সদস্যের বিশাল এক কমিটি গঠন করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রীকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন ১৪ জন সচিব।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের পাশাপাশি পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি; কেয়ার, অক্সফাম, ব্র্যাক, কারিতাসসহ কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিও আছেন কমিটিতে। এ কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে কাজ করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর মহাপরিচালক।

কমিটির কার্যপরিধিতে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের কথা রয়েছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে সহায়ক যন্ত্রপাতির তালিকা করে সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে কেনার সুপারিশও করবে এ কমিটি।

কার্যপরিধিসহ ২০০৯ সালে কমিটি গঠন করার পর ২০১০ সালে ২৭ জানুয়ারি সদস্যরা প্রথম বৈঠক করেন। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার বৈঠক হয় ২০১১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর।

২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল দেশে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজের বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চান হাইকোর্ট। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রতিবেদন আকারে তা গত ১২ মের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। এরপর আদালতে একটি প্রতিবেদন দেয়া হয। এতে বলা হয়, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে প্রশিক্ষণের কাজ চলছে।

এর আগের একটি বৈঠকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান জানান, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর জন্য তারা কিছু যন্ত্রপাতি পেয়েছেন। আরো কিছু যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ৫৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে রাজধানীকে আটটি জোনে ভাগ করে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হবে। সেনাবাহিনী নতুন কিছু যন্ত্রপাতি পেলেও সেসব নিয়ে কোনো যৌথ মহড়া হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের সিডিএমপি) মাকসুদ কামাল জানান, রাজধানীতে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য ১৩ জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। লোকজনকে উদ্ধার করে সেখানে রাখা যাবে। এ ব্যাপারে কাজ করতে ৩৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

আদালতের নির্দেশের সাত বছর পর অগ্রগতি এটুকুই। তবে দেশে ভূমিকম্প অনুভুত হলে একটু নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয় ও কমিটি। তারা তাৎক্ষণিকভাবে বৈঠকে বসেন, এরপর আবার নীরব হয়ে যান।

সোমবার ভোররাতে ভূমিকম্পের পর যেমন হয়েছে। দুর্যোগ মন্ত্রণালয় বৈঠক করেছে। এরপর মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ভূমিকম্প মোকাবিলায় ৬৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। আরো ১৪৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল জানালেন, ঢাকায় ৭২ হাজার বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্তু ভূমিকম্প মোকাবিলায় সমন্বিত সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আদালতের নির্দেশনার অগ্রগতির বিষয়ে কিছু জানাননি তারা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।