দীপক সরকার, বগুড়া প্রতিনিধি: আগের দিনের মতো গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতির মেলাগুলো অনেকটাই কমে গেছে। মেলা বা গ্রামীন সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে গেলেই চোখে পড়তো একটি মুখরোচর খাবারের প্রতি। সেটি হলো পাঁপড়। এখন কালের বিবর্তনে গ্রামীন সংস্কৃতি মেলা ও অনুষ্ঠান অনেকটা কমে গেছে।
ঈদ,পূজা ও বৈশাখীমেলা বিভিন্ন পার্বন যতটুকুই রয়েছে, সে গুলোতেই পাঁপড় খাওয়া বা বিক্রয় করার দৃশ্য অনবরতই চোখে পড়ে এবং এর জুড়িমেলা ভাঁড়। পাঁপড় মুখরোচক খাবার হওয়ায় এটি বাংলার ঐতিহ্যের একটি আদি শিল্প। ‘পাঁপড়’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন এমন লোক খুজে পাওয়া খুবই কষ্ট সাধ্য। অনেকেই আবার নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে পাঁপড় খেতে ভালোবাসেন।
আর আমাদের লোভনীয় ও মুখরোচক খাবার হিসেবে পরিচিত পাঁপড় তৈরী করছে কিছু মানুষ। তাদের মধ্যে নারীরাই অধিকাংশতায় রয়েছে। গ্রামীন নারীরা তাদের সাংসারিক দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ আয়ের আশায় পাঁপড় তৈরীতে মনযোগ দিচ্ছে। অনেক নারীরা আবার পাঁপড় তৈরী ও বিক্রি করে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কাজ করে যাচ্ছে। অনেকটা তাদের জীবন জীবিকা এই পাঁপড় শিল্পের উপর নির্ভরশীল। পাঁপড় তৈরী ও বিক্রয় করে ভাগ্য বদলানোর চেষ্টায় রয়েছে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার শতাধিক নারী।
সম্প্রতি সরেজমিনে নন্দীগ্রাম পৌরসভার গুন্দইল গ্রামে গিয়ে জানা যায়, পাঁপড় তৈরীতে এমন শতাধিক নারীর ভাগ্য বদলানোর চেষ্টার জীবন গাঁথার অনেক গল্প। অল্প পুঁজিতে অধিক লাভ হওয়ায় এ গ্রামের প্রায় শতাধিক নারী পাঁপড় উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ পাঁপড় শিল্পের সঙ্গে জড়িত এসব নারীরা। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জীবন জীবিকাই এখন নির্ভর করছে পাঁপড়ের উপর। এই ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করতে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করলেই চলে। তবে অল্প পুঁজিতে লাভজনক এ ব্যবসা হলেও এটিকে বড় আকারে করতে গেলে অনেক পুঁজির প্রয়োজন। উপকরণ হিসেবে পাঁপড় তৈরীতে ময়দা, লবন, খাবার সোডা, কালোজিরা, বেসন ও খাবারের পছন্দমত রং। এক কেজি ময়দায় ৬৫ পিস পাঁপড় তৈরী হলেও তিনটি পাঁপড়ের বিপরীতে উৎপাদন খরচ হয় ১ থেকে ২ টাকা। আর বিক্রয় হয় ৫ টাকায়।
গুন্দইল গ্রামের গৌর চন্দ্র জানান, ১৫ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছি। তিনি পাঁপড় তৈরীর গল্প ও প্রক্রিয়ায়ে বলেন পাঁপড় তৈরি করতে প্রথমে একটি বড় পাত্রে ময়দা নিয়ে এর সঙ্গে পরিমাণ মতো লবণ, কালোজিরা, খাওয়ার সোডা, বেসন ও খাবারের রং ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর হাঁড়িতে পানি দিয়ে চুলা জ্বালাতে হবে। পানি ফুটে উঠলে হাঁড়ির ওপর একটা স্টিলের প্লেট বসিয়ে তাতে এক চামচ মিশ্রণ ঢেলে দিয়ে প্লেটটি ঘুরিয়ে মিশ্রণটুকু পাপড়ের আকারে গোল করতে হবে। কিছুক্ষণ পর পাঁপড়টি সিদ্ধ জলের ভাপে সিদ্ধ হলে নামিয়ে রোদে শুকাতে হবে। তারপর সেগুলো ভেজে বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়।
পাঁপড় তৈরি করতে বিশেষ কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। ২-৩ দিন প্রশিক্ষণ নিয়েই পাঁপড় তৈরি করা যায়। পাঁপড় তৈরি করতে তার সাথে যোগাযোগ করে শিখে নেওয়া যেতে পারে তিনি আরও জানান।
পাঁপড় মচমচে ও মুখরোচক খাবার বিধায় সব বয়সী মানুষই পাঁপড় খেতে পছন্দ করে। লোক সমাগম বেশি, এমনস্থানে এর ব্যবসা ভালো চলে। বর্তমানে অধিকাংশ দ্রব্যের মুল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এ শিল্প অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এই শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে অন্য কোনো কাজ করতে পারছেনা বলে পাঁপড় তৈরির একাধিক কারিগররা জানান। যার ফলে এ কাজই এখন জীবন বদলানোর শেষ গল্পে পরিণত হয়েছে। দ্রব্যমুল্যের উর্দ্ধগতি হওয়ায় পাঁপড় তৈরি করতে অনেকটা হিমশিম খেতে হলেও পরিবারের ভরণ পোষণ চালাচ্ছেন এ শিল্প থেকেই। বাংলা বছরের ভাদ্র থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত ৬ মাস পাঁপড় তৈরীর চাহিদা থাকে বেশি। আর বর্ষা মৌসুমে এটা তৈরি করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কারণ পাঁপড় তৈরির পর তা রোদে শুকাতে হয়।
বর্তমানে বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও নাটোরসহ আশপাশের জেলা থেকে নন্দীগ্রাম পৌর এলাকার গুন্দইল গ্রামে পাঁপড় ক্রয় করতে আসেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। গুন্দইল গ্রামের শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পাঁপড় শিল্পের সঙ্গে তাদের ভাগ্য জড়িত। পাঁপড় শিল্পের আরও প্রসার ঘটাতে সুদমুক্ত সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা পেলে আরও অগ্রগতি হবে বলে জানিয়েছেন এই পাঁপড় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত গুন্দইল গ্রামবাসী।
এ বিষয়ে নন্দীগ্রাম উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা ইয়াসমিন জানান, গুন্দইল গ্রামটি পৌরসভার আওতায় হওয়ায় আমরা তাদের ভিজিডি সুবিধা দিতে পারছি না। তবে তাদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছি এবং যারা অষ্টম শ্রেণি পাশ নারীদের জন্য অচিরেই ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। যাতে করে তারা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।


