কালীগঞ্জে তিন তলা বাড়িসহ অঢেল ধন সম্পদের মালিক পেলেন বয়স্ক ভাতার কার্ড

আরিফ মোল্ল্যা, ঝিনাইদহ॥ ২৩ জুলাই’২০১৭: আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, গরীব, অসহায়, প্রতিবন্ধী ও অক্ষম ব্যক্তিদের বয়স্ক ভাতার কার্ড পাওয়ার কথা থাকলেও সে নিয়মনীতি উপেক্ষিত হয়েছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বয়স্কভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সকল নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এবার তিনতলা বাড়িসহ প্রায় অর্ধ কোটি টাকার সম্পদের মালিককে দেয়া হয়েছে বয়স্ক ভাতা কার্ড।

কালীগঞ্জ কলেজ পাড়ার নিশি কান্ত সাহার রয়েছে ৬ শতক জমির উপর একটি তিনতলা বিশিষ্ট বাড়ি। কলেজপাড়ার “মাঠ কালীবাড়ীর” পিছনে রয়েছে ১০ শতক জমি। যার আনুমানিক মূল্য ২০ লক্ষাধিক টাকা। এছাড়া উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের বেথুলী গ্রামে রয়েছে ১০ কাঠার উপর দুইটি পাকা ঘর। তার বড় ছেলে, ছোট ছেলে ও ছোট ছেলের স্ত্রী চাকুরী করেন। সব মিলিয়ে কোটি টাকার সহায় সম্পদের মালিক নিশি কান্ত সাহা বয়স্ক ভাতা কার্ড পাওয়ায় এলাকাবাসী হতবাক হয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজ পাড়ার একাধিক ব্যক্তি জানান, একই পাড়ার দরিদ্র ও অসহায় মৃত শ্রী চারন দাসের ছেলে ইষ্টম দাসের বয়স ৭০ বছর। ইষ্টম দাসের তিন ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী। অপর মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েটা পরের বাসা-বাড়িতে কাজ করে। আর ইষ্টম দাস হাট বাজারে তরি-তরকারি কুড়িয়ে সংসার চালায়।

একই পাড়ার আরেকটি অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তান মৃতঃ পূর্ণচন্দ্র অধিকারির ছেলে নিমাই অধিকারী। তিনি পেশায় গাড়ী চালক ছিলেন। গত ৮/১০ বছর যাবত তিনি গাড়ী চালানো ছেড়ে দিয়েছেন। তার দুই মেয়ে এক ছেলে রয়েছে। মেয়ে দুটির বিয়ে হয়েছে। আর ছেলেটি স্বর্ণ কারিগরের কাজ করে কোন মতে সংসার চালাচ্ছে। অথচ দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থার কারনে প্রকৃত বয়স্ক ভাতার কার্ডধারীরা বয়স্ক ভাতার কার্ড পাননি। কার্ড পেয়েছে অঢেল সহায় সম্পদ ও অর্ধ কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া নিশি কান্ত সাহা। যার বয়স্ক ভাতার বহি নং ৬৭৩৩। প্রতি মাসে তিনি ৫০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পাবেন বলে বহিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বয়স্ক ভাতার ওই বহিতে স্বাক্ষর করেছেন উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আইনাল হক।

নিশি কান্ত সাহার ব্যাপারে মালিয়াট ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, তার বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কোন প্রশ্ন্ই আসে না। কারন তার চলাচল ভাল। গ্রামে আগে ২০ বিঘার মত জমি ছিল। সেই জমি বিক্রি করে কালীগঞ্জে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। সে এক সময় ব্লাকের (ইন্ডিয়া থেকে অবৈধ পথে পণ্য আনা) ব্যবসা করতো। গ্রামে এখনও ১০ কাঠার উপর দুটি পাকা ঘর রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজ পাড়ার কয়েক ব্যক্তি জানান, নিশি কান্ত সাহার দুই ছেলে। বড় ছেলে প্রদীপ সাহা ইউনিলিভার কেম্পানীতে চাকুরী করেন। চাকুরীর সুবাদে তিনি য়শোর জেলার অভয়নগর উপজেলাতে থাকেন। ছোট ছেলে বেথুলী ডিএসবি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ছোট ছেলের স্ত্রী পলি রানী সাহাও কালীগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর এলাকার রোস্তম আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
এমন ব্যাক্তিকে বয়স্ক ভাতার কার্ড দেওয়ায় বিরুপ মন্তব্য প্রকাশ করেছেন স্থানীয় একাধিক নারী-পুরুষ। তারা জানান, কলেজ পাড়ায় অনেক ব্যাক্তি আছেন, য়ারা ঠিক মতো দু’বেলা পেট পুরে খেতে পায় না। অথচ তাদের বিষয়টি বিবেচনা না করে অর্ধ কোটি টাকার মালিককে দেয়া হয়েছে বয়স্ক ভাতার কার্ড।

পৌর সভার ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফাইজুর রহমান চুন্নু জানান, কলেজ পাড়ায় ৫/৬ টি নতুন কার্ড বরাদ্দ এসেছে। যাদের দেয়া হয়েছে তারা সবাই প্রভাবশালী। তিনি এক রাজনৈতিক নেতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ৮৮ টি কার্ড বরাদ্দ হয়েছে। সেখানে কাউন্সিলদের ভাগে ৯ টি করে পড়ে। কিন্তু তিনি (রাজনৈতিক নেতা) আমাদের দিয়েছেন ২ টি করে। নিশি কান্তের বয়স্ক ভাতার কার্ড দেয়ার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান তাকে কার্ডটি করে দিয়েছেন বলে শুনেছেন। এছাড়া নিশি কান্ত অনেক ধন সম্পদের মালিক ও বাড়ি ২ তলা বলে তিনি স্বীকার করেন।

উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আইনাল হক জানান, বয়স্ক ভাতার কার্ড পেতে হলে কমপক্ষে পুরুষের ৬৫ ও মহিলার ৬২ বছর বয়স হতে হবে। যারা অস্বচ্ছল, অসহায় ও গরীব তারাই এই কার্ড পাওয়ার যোগ্য। এছাড়া প্রতিবন্ধী ও অক্ষম ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাবে। তিন তলা বাড়ির মালিক নিশি কান্ত সাহা কিভাবে কার্ড পেলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ খবর নিয়ে দেখবো। যদি ৩ তলা বাড়ির মালিক কার্ড পেয়ে থাকেন সেটা আমি বাতিল করে যে পাওয়ার যোগ্য তাকে দেবার চেষ্টা করবো।

এ ব্যাপারে নিশি কান্ত সাহা বলেন, কার্ড করিলাম। তা ক্যানসেল করে দিচ্ছি। আমার তিন তলা বিলাস বহুল বাড়ি, অবস্থাও ভাল। কিন্তু আমার খুব অসুবিধা। ছেলেরা যা আয় করে তাদেরই চলে না। আর সব ছেলেরা তো আমাকে টাকা পয়সা দেয় না। সকলের যখন কু-দৃষ্টি লাগছে তা আর দরকার নেই।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাদেকুর রহমান জানান, একজনের পক্ষে সব কি দেখা সম্ভব হয়? তবে মেয়র ও কাউন্সিলর সাথে কথা বলে তালিকাগুলি নিয়ে যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব। এজন্য সময়ের প্রয়োজন।

 

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।