খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের কচুবুনিয়া স্লুইসগেটে অভূতপূর্ব ফাটল ও ধসের পর এর একটি বিশাল অংশ সম্পূর্ণ নিচের দিকে দেবে গেছে।
স্লুইসগেটের মোট তিন অংশের এক অংশ একেবারে বিধ্বস্ত হয়েছে এবং বাকি অংশগুলোও দেবে গিয়ে চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
যেকোনো মুহূর্তে এই জরাজীর্ণ ও ভাঙা অংশ দিয়ে শিবসা নদীর জোরালো জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে প্রলয়ঙ্করী প্লাবনের সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে চরম আতঙ্ক ও ত্রাসের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় হাজার হাজার মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৬ আগস্ট রাতের কোনো একসময় শিবসা নদীতে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার সময় কচুবুনিয়া স্লুইসগেটে কাঠামোতে এই ভয়াবহ ফাটল দেখা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে ওই অংশের একটি বড় অংশ ভেঙে নিচের দিকে দেবে যায়।
পানি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটির এমন নাজুক দশায় পুরো এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কচুবুনিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চল নদী-খাল ও নিম্নাঞ্চল ঘেরা হওয়ায় শিবসা নদীর জোয়ার-ভাটার তীব্র চাপ সরাসরি আঘাত হানছে এই ভঙ্গুর অবকাঠামোর ওপর।
১৬-১৭ পোল্ডারের আওতাধীন এই স্লুইসগেটটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় বিপর্যয়ের পরিধি শুধু কচুবুনিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকছে না।
এ বিষয়ে ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল হাসান গাজী অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান, “এই স্লুইসগেট দিয়ে যদি উন্মুক্তভাবে পানি প্রবেশ করে, তবে পাইকগাছার গদাইপুর, কপিলমুনি এবং হরিঢালী—এই তিনটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্লাবিত হবে। এতে এলাকার সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকার সম্পদ, কৃষিজমি এবং মৎস্য ঘের ধ্বংস হয়ে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হবে।
স্লুইসগেটের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও ভেঙে পড়লে কচুবুনিয়াসহ শ্যামনগর, আগরঘাটা, কাজিমুছা, মালতি, গদাইপুর, তকিয়া ও মঠবাটী এলাকার বসতি, কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট এবং শত শত হেক্টর কৃষিজমি ও মাছের ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
জরুরি ও জীবন-মরণ এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল প্রশাসনের ভূমিকা জনমনে গভীর প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। গদাইপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেখ খোরশেদুজ্জামান জানান, “এটার জন্য আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বা বরাদ্দ নেই, যার কারণে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নিজ উদ্যোগে কাজ করতে পারছি না।
এটি সম্পূর্ণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন। তবে প্রশাসন বা বোর্ড থেকে দায়িত্ব দিলে আমরা কাজ করব; তবুও আমি বিকেলের দিকে লোকজন নিয়ে নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যাচ্ছি।”
এদিকে স্লুইসগেটটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ও জরুরি মেরামতের বিষয়ে জানতে পাউবোর সংশ্লিষ্ট এসও রাজু হাওলাদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা ও খুদে বার্তা (SMS) পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জনগুরুত্বপূর্ণ এমন একটি জরুরি মুহূর্তে দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা ও নিরাসক্ত ভূমিকা এলাকবাসীর উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষের কাছে ভাঙা স্লুইসগেট বা দুর্বল বাঁধ কেবল একটি ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতি নয়; এটি সর্বস্ব হারানোর এক নির্মম দলিল। অতীতেও এই অঞ্চলের বিভিন্ন পোল্ডারে সামান্য ফাটল বা অবহেলার কারণে মুহূর্তের মধ্যে আস্ত গ্রাম ও ফসলের মাঠ প্লাবিত হওয়ার বহু মর্মান্তিক ইতিহাস রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, একবার লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করা শুরু করলে তা রোধ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তখন বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে গবাদিপশু ও মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার মতো অপূরণীয় ক্ষতি নেমে আসে। কচুবুনিয়ার এই ঘটনাও সেই পুরোনো আতঙ্ককে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর স্পষ্ট কথা—এটি কেবল একটি স্লুইসগেটের আংশিক ফাটল নয়, এটি লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসের এক অশনি সংকেত। অবিলম্বে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কেবল দায়সারা বা জোড়াতালির সংস্কার নয়, এই গুরুত্বপূর্ণ স্লুইসগেটের কাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই করে দ্রুত স্থায়ী ও মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অচিরেই এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে গোটা পাইকগাছাকে। স্থানীয়রা আশা করছেন, অনভিপ্রেত যেকোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত জরুরি মেরামতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।




