চোরের দশদিন আর গৃহস্থের একদিন যুবক আরমানের বুদ্ধিমত্তায় ধরাশায়ী প্রতারকচক্র

স্টাফ রিপোর্টার,ঝিনাইদহ॥ প্রতারকচক্রের সদস্যরা সেজেছে কখনও পুলিশ কর্মকর্তা, র‌্যাব অফিসার, গাড়ীর মালিক আবার কখনও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা। আবার কখনও তারা আপনজন মারা যাওয়ার কথা বলে বিপদ পথের যাত্রী সেজে ইজিবাইকে উঠে বসেছে। এরপর নানা ছল চাতুরী আর মিথ্যা অভিনয় করে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের ইজিবাইকের চালকদের বোকা সাজিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বাইক নিয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল প্রতারকরা। গত ৩ মাসে এ চক্র কালীগঞ্জ শহর থেকে মোট ৮ টি ইজিবাইক হাতিয়ে নিয়েছে।

ইজিবাইক খোয়া যাওয়ার পর অনেকে থানাতে জিডিও করেছেন। পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এ প্রতারকদের ধরার জন্য চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্ত চতুর এ চক্র ছিল ধরাছোয়ার বাইরে। কিন্ত কথায় আছে চোরের দশ দিন আর গৃহস্থের একদিন। অবশেষে আরমান নামের এক ইজিবাইক চালক যুবকের বুদ্ধিমত্তার কাছে এ চক্রের এক সদস্য ধরাশায়ী হয়ে এখন পুলিশের খাঁচায়। পুলিশ এ প্রতারকচক্রের মূলোৎপাটনে আটক প্রতারকের নিকট থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান শুরু করেছে।

বুদ্ধিমান যুবক নলডাঙ্গা গ্রামের আরমান হোসেন জানায়, সম্প্রতি নলডাঙ্গা বাজার থেকে প্যান্টশার্ট পরা ২ ব্যক্তি নিজেদেরকে শিক্ষা ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ থেকে কিছু বই আনতে আমার বাইকের আপ-ডাউন ২০০ টাকা ভাড়া ঠিক করে। কিন্ত এখন বছরের প্রায় শেষের দিক উপজেলা থেকে বই দেবে এমন কথায় আমার মনে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তারপরও সাম্প্রতিক প্রতারকচক্রের কর্মকান্ড মাথায় রেখেই আমি ভাড়ায় যেতে রাজি হয়ে যায়। অতি সাবধানতার মধ্যদিয়ে তাদেরকে নিয়ে উপজেলা চত্বরে পৌছাই। সেখানে গিয়ে গাড়ি থেকে দু’জনেই নেমে উপজেলা পরিষদের ভবনের আড়ালে চলে যায়। বেশ খানিকক্ষণ পরে ঘুরে এসে বলে বই দিতে একটু বিলম্ব হচ্ছে। এরপর একজন অন্য জনকে কিছু খাবার আনতে বলে। কথামতো ৩ জনের জন্য ৩ বোতল জুস নিয়ে ফিরে এসে আমাকে ১টা জুস খেতে দেয়। তাদের চালচলন, কথাবার্তা ও জুস দেয়ার বিষয় নিয়ে আমার মনে সন্দেহ আরো শক্তভাবে দানা বাধে। আমি জুসের বোতলটি হাতে নিয়ে ভাবতে থাকি অবশ্যই এই জুসের মধ্যে কিছু একটা দেয়া আছে। যে টা খেলে আমি চেতনা হারিয়ে অন্যদের মত হারাতে পারি আমার বাইকটিও। ফলে জুসের বোতলটি হাতে নিয়ে একটু একপাশে গিয়ে শহরের ইজিবাইক চালক আমার চাচাতো ভাইকে মোবাইলে বিপদে আছি,তাই খুব দ্রুত উপজেলা চত্বরে আসতে বলি। তারা আমাকে জুসটা খেতে আবার অনুরোধ করে। আমার প্রেমিকা ফোন দিয়েছে প্রতারকদের সামনে মিছেমিছে মোবাইলে কথা বলে আমার ভাইয়ের জন্য সময়ক্ষেপন করতে থাকি। আমি জুস না খাওয়াই তাদের মধ্যে বিচলিত ভাব লক্ষ্য করি। আমি তাদের চতুরতা বুঝে ফেলেছি এমন ভেবে তারাও আমার ওপর কিছুটা সন্দেহপ্রবন হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা আমার নিকট থেকে জুসটা ফেরত চায়। কিন্ত আমি আবার বলি মোবাইলে কথা শেষ করে খাবো। তারা উল্টো ফাঁদে পড়ে গেছে ভেবে কিছুক্ষণ পরে মেইন বাসস্ট্যান্ডে কাজ আছে তাই আমাকে বসতে বলে অন্য একটি ইজিবাইকে রওয়ানা দেয়। তখন আমি নিশ্চিত হই এরাই সে প্রতারকচক্র। কিন্ত তখনও আমার ভাই ঘটনাস্থলে পৌছায়নি। তারপরও কাউকে কিছু না বলে আমি একাই ওই ইজিবাইকের পিছু নিই। খানিক যাওয়ার পর আমার ভাইয়ের ইজিবাইক সামনে চলে আসে। এরপর প্রতারকদের বহনকরা বাইকের চালককে বলে থামিয়ে দিলেই এক প্রতারক দৌড়ে পালায়। কিন্ত অপরজন অর্থাৎ প্রতারকদের মূল হোতা ভন্ড অফিসারকে স্থানীয়দের সহযোগীতায় ধরে ফেলি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌছে পুলিশ এই প্রতারককে থানায় নিয়ে আসে। এরপর ইজিবাইক খোয়ানো লোকজন একে একে থানায় এসে এ প্রতারককে দেখে সকলে চিনতে পারে। তারা থানা পুলিশকে অবহিত করে প্রত্যেকটি ইজিবাইক নেওয়ার পেছনে এ প্রতারকই প্রধান হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) ইউনুচ আলী জানান, আমরা চেষ্টা চালাচ্ছিলাম এচক্র ধরার জন্য। কিন্ত বাইকচালক যুবক আরমানের বুদ্ধিমত্তার কারনে আমাদের কাজটা সহজ হয়ে গেছে। ফলে আরমানের বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। তিনি জানান, আরমানের বুদ্ধিমত্তায় ধৃত প্রতারক পুলিশের কাছে প্রতারনার বিষয়ে জড়িত থাকার কথা শিকার করেছে। এখন এ চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতে পুলিশী তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আটক প্রতারকের স্বীকারোক্তি মোতাবেক আরেক জনকে আটক করা হয়েছে। এ চক্রের মুলোৎপাটনে পুলিশ আরো তৎপর হবে বলে তিনি জানান।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।