রাজিব শর্মা, চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ চট্টগ্রাম আকবর শাহ থানার কালিরহাট এলাকায় সিটি গেইটের অদূরে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কারখানার সামনে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে চাকায় পিষ্ট করে রেজাউল করিম রনি (৩২)কে হত্যার ঘটনা ঘটে সোমবার বিকালে।
এ নিয়ে স্থানীয় লোকজন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। এতে প্রায় আধাঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় সড়কের দুই পাশে যানজট। তবে আকবর শাহ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসের চালক ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেয়।
বিক্ষোভকারীদের দাবি- বাসচালক ও তার সহকারী অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে রনিকে মারধর করে চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করে। তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আকবর শাহ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জসিম উদ্দিন বলছেন- রনিকে ধাক্কা মেরে ফেলে হত্যার কোনো তথ্য তারা পাননি। এ ব্যাপারে লিখিত কোনো অভিযোগ রনির পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো করা হয়নি। অভিযোগ পেলে হত্যা মামলা করা হবে।
থানা পুলিশের এমন গা-ছাড়া ভাবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে অভিযুক্ত বাসের চালক ও তার সহকারী। বাসটিও পড়ে রয়েছে ঘটনাস্থলে। তবে স্থানীয়দের বিক্ষোভের কারণ খুঁজতে গিয়ে মঙ্গলবার সকালে বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। এরমধ্যে পাওয়া গেছে রনির বন্ধু ও বাসটির প্রত্যক্ষদর্শী এক যাত্রীর মুখে রনি হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা।
রনির ঘনিষ্ঠ বন্ধু মো. সাইদুর রহমান মারুফ মঙ্গলবার সকালে জানান, রনি সোমবার বিকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী থেকে ৪নং বাস যোগে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। বাস থেকে ফোন করে সে জানায়, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বাসচালক ও সহকারী তার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে। তাকে মারধর করেছে। তাকে সাহায্য করতে যেন চট্টগ্রাম সিটি গেট এলাকায় আসা হয়। এভাবে আরও কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে সে। কিন্তু বন্ধুরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই বাসটি সিটি গেট এলাকা ছেড়ে কালিরহাট এলাকার গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কারখানার সামনে এসে পৌঁছায়। এসময় চালক ও সহকারী তাকে মারধর করে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তার ওপর গাড়ি চালিয়ে দেয়।
সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামুসল হুদা খোকন গুরুতর আহত অবস্থায় রনিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই রনির মৃত্যু ঘটে।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে খোকন জানান, বেলা আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে সিটি গেট সংলগ্ন কালিরহাট এলাকায় সড়কের পাশে একজনকে পড়ে থাকতে দেখি। কাছে গিয়ে দেখি লোকটির হাত ও মাথায় রক্ত। তাকে দ্রুত তুলে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটি মারা যায়। পরে জানতে পারি লোকটির নাম রেজাউল করিম রনি। কালিরহাট এলাকাতেই তার বাড়ি।
কালিরহাটের বাসিন্দা মো. ফরিদও ওই বাসের যাত্রী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মঙ্গলবার দুপুরের দিকে তিনি বলেন, ভাটিয়ারি থেকে চার নম্বর বাসে (চট্টমেট্রো জ ১১-১৮০৩) কালিরহাটে আসছিলাম আমরা। ঈদুল আজহা উপলক্ষে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছিল বাসের কন্ট্রাক্টর। এ নিয়ে চালক, কন্ট্রাক্টর ও তাদের আরেক সহকারীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয় রনির। একপর্যায়ে তারা রনিকে মারধর করে। পরে রনি গাড়িতে থাকা অবস্থায় তার এক বন্ধুকে ফোন করে মারধরের কথা জানায়। বন্ধুদের তিনি সিটি গেইট এলাকায় আসতে বলেন। কিন্তু বাসটি সিটি গেইট ছাড়িয়ে যাওয়ার পর গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কারখানার সামনে রনিকে মেরে চলন্ত অবস্থায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এতে রনি সড়কের ওপর গড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে চালক তার ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দিলে চাকায় পিষ্ট হয় সে। পরে বাস থামিয়ে চালক ও সহকারীরা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে বন্ধুরা ছুটে এসে বাসটি জব্দ করে। ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে। বাসের চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তারের জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ঘটনার এই বিবরণ আকবর শাহ থানার পুলিশের কাছেও দিয়েছেন বলে জানান মো. ফরিদ।
নগরীর আকবর শাহ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, রনির মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। অভিযোগ উঠেছে গাড়ির চালক ও সহকারী তাকে মেরে গাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছে। তবে এখনো এ ব্যাপারে তার পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে হত্যা মামলা নেয়া হবে।
তবে ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে বাসের ভেতরে চালক ও তার সহকারীর সঙ্গে রনির কথা কাটাকাটি হয়েছে একজন প্রত্যক্ষদর্শী এমন কথা জানিয়েছেন বলে স্বীকার করেন ওসি। আর ঘটনার পরপরই বাসটি রেখে চালক ও সহকারী পালিয়ে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, রেজাউল করিম রনি সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের গুল আহমদ জুট মিলস এলাকার ওয়ালীউল্লাহর পুত্র। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। মা, বাবা ও দুই বোন আমেরিকায় থাকেন। চট্টগ্রাম মহানগরীর কাট্টলী লতিফপুরে আড়াই বছরের একমাত্র শিশু শাবা ও স্ত্রী নিয়ে নিজস্ব ভবনে থাকতেন রনি। সোমবার বিকালে ভাটিয়ারি থেকে ওই বাড়িতে ফিরছিলেন রনি।
রনির স্বজনরা জানান, আর মাত্র ১৯ দিন পর স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় পাড়ি জমানোর কথা রনির। সেখানে গিয়ে মা-বাবা ও বোনদের সঙ্গে থাকার কথা। ভিসাও হয়ে যায় তার। কিন্তু ঘাতক বাসচালক ও সহকারীর বর্বরতার কারণে তার আর আমেরিকায় যাওয়া হলো না।
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক সারওয়ার হাসান জামিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২১শে জুলাই রাতে ঢাকা যাওয়ার পথে হানিফ পরিবহনের বাসে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত চট্টগ্রামের সন্তান পায়েলকে ভাটেরচর সেতুর নিচে ফেলে হত্যার ঘটনা ভুলতে না ভুলতে কালিরহাটে রনিকে ফেলে দিয়ে হত্যা করল অসভ্য বাসচালক ও তার সহকারী। এটা খুবই মর্মান্তিক। এসব ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।


