বিশেষ প্রতিবেদকঃ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আজ বৃহস্পতিবার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন আইনজীবীরা। দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই জেরা। জেরা শেষে আদালত আগামী ৬ জুলাই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
পুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত পঞ্চম বিশেষ জজ ড. আক্তারুজ্জামানের আদালত এই দিন ধার্য করেন।
এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বেলা পৌনে ১১টার দিকে আদালতে চত্বরে পৌঁছান। সেখানে দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁকে স্বাগত জানান।
খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আবদুর রেজাক খান, এ জে মোহাম্মদ আলী, সানাউল্লাহ মিয়া, আমিনুল ইসলাম, জাকির হোসেন, গাজী কামরুল ইসলাম সজল প্রমুখ।
বেলা ১১টায় শুনানি শুরু হয়। প্রথমে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার শুনানি হয়। সেই শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতকে বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালত, ঈদের আগে শুনানির শেষ পর্যায়ে আমরা কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা পারিনি। কারণ আপনি শুনানির শেষ পর্যায়ে এসে এক সপ্তাহের মুলতবি করে এজলাস থেকে উঠে গেছেন। ঈদের আগে আমাদের আইনজীবীদের অনেক বেশি প্রেসার থাকে। এ কারণে শুনানির মুলতবি করতে হলে একটু বেশি সময় দিয়ে করলে ভালো হয়।’
‘এখনো সারা দেশে ঈদের আমেজ বইছে। অথচ আমরা ম্যাডামকে নিয়ে আদালতে হাজির হয়েছি। যাই হোক, আপনি সামনের আগামী দিনগুলোতে বিষয়টি একটু বিবেচনায় নিলে ভালো হয়। আমাদের আইনজীবী এবং প্রসিকিউশন টিমের পক্ষ থেকে আপনাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আপনাদেরকেও ঈদের শুভেচ্ছা। আমি পূর্বের বিচারকদের অনুসরণ করে মামলার কার্যক্রম মুলতবি করে যাচ্ছি। নতুন করে কিছুই যোগ করি নাই।’
পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, ‘দেশের সবাই জানে না জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা কী। শুধুমাত্র ম্যাডাম আসছেন নতুন তারিখের দিন ধার্য হচ্ছে। আর প্রসিকিউশন টিম বিরোধিতা করছে। এভাবে দিনের পর দিন যাচ্ছে। দেশবাসী জানেই না ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে কী মামলায় এভাবে হাজির করা হয়। কোনো প্রিন্ট মিডিয়ায়ও এ বিষয়টি আসে না।’
‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এটি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে ম্যাডাম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে এই ট্রাস্ট করা হয়। কিন্তু মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তাও তার প্রতিবেদনে বলেছিলেন, এ মামলায় ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কোনো যোগসাজশ বা হস্তক্ষেপ ছিল না। কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় কোনো ব্যক্তি বলতে পারেনি যে, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার নির্দেশে কারো কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা অর্থায়ন করেছে। তাহলে ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে এভাবে হয়রানি করা হচ্ছে কেন?’
আবদুর রেজাক বলেন, ‘আমি অনেক অসুস্থ। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছি না। আজকে মামলার তদন্ত কর্মকতা হারুন-অর-রশিদকে আমি কিছু জেরা করব। আর বাকি জেরাটা আইনজীবী আমিনুল ইসলাম করবেন।’
এরপর আবদুর রেজাক খান তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করে বলেন, ‘এ মামলার প্রথমদিকে যে অনুসন্ধান রিপোর্ট দিয়েছেন, তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। সে রিপোর্ট কি আদালতে দিয়েছেন?’
এ সময় আদালত বলেন, ‘বিজ্ঞ আইনজীবী, আপনি আজকের জেরার মধ্যেই থাকেন।’
পরে আবদুর রেজাক খান বলেন, ‘চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আপনি স্টেটমেন্ট কি দিয়েছেন?’
জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘না দিই নাই।’
পরে আইনজীবী বলেন, ‘আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯/০১/২০০৫ সালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। রেজিস্ট্রেশনের আগে-পরে মিলিয়ে সেখানে ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিল এবং ১৮/০১/২০০৫ তারিখে ২৭ লাখ টাকা জমা হয়। কিন্তু বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কোনো টাকা আহরণ করেছেন বা সংগ্রহ করেছেন এ রকম কোনো তথ্য আছে কি?’
জবাবে তদন্ত কমকর্তা বলেন, ‘না নেই।’
আইনজীবী বলেন, ‘হারুন-অর-রশিদ সাহেব ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যে অর্থ জব্দ করেছেন বায়তুল মোকাররমের সামনে থালা নিয়ে বসলে এর চেয়ে বেশি অর্থ পাওয়া যায়। আপনি কি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছেন?’
জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘না করিনি।’
এই পর্যায়ে আইনজীবী বলেন, ‘আপনি তথ্য গোপন করেছেন?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
আইনজীবী বলেন, ‘চ্যারিটেবল ট্রাস্টের হিসাব জব্দ করার জন্য ঢাকা মহানগর জজ আদালতে আবেদন করেছিলেন তা মঞ্জুর হয়েছিল কি?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘হ্যাঁ হয়েছে।’
আইনজীবী বলেন, ‘আপনি কি জব্দ করেছেন?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘না করিনি।’
আইনজীবী বলেন, ‘অ্যাকাউন্টে সুনির্দিষ্ট হিসাব বিবরণী পেয়েছেন এমন কোনো তথ্য কি চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘না সুনির্দিষ্ট হিসাব বিবরণী নেই।’
খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী আমিনুল ইসলাম পরের প্রশ্নগুলো করে বলেন, ‘অপর আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না টাকা নিয়েছেন এ ধরনের অভিযোগে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আপনার কাছে লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ করেছেন?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘না করেনি।’
এরপর আইনজীবী বলেন, ‘ম্যাডাম খালেদা জিয়া এ সময় কোনো নগদ টাকা উত্তোলন করেছেন?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘হ্যাঁ করেছেন।’
জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘এটা আপনার মনগড়া তদন্ত।’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
এবার আইনজীবী বলেন, ‘আপনি বিশেষ মহলের নির্দেশে রিপোর্ট দাখিল করেছেন।’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
পরে আইনজীবী বলেন, ‘প্রকৃত হিসাব বিবরণীর সঙ্গে আপনার দেওয়া বিবরণীর কোনো মিল নেই্।’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
আইনজীবী বলেন, ‘আপনি সঠিক হিসাব বিবরণী দাখিল করেননি?’
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
আইনজীবী বলেন, ‘কোনো অনিয়ম পাননি বিধায় প্রথম অনুসন্ধান কর্মকর্তা একটি ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছেন?’
জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একেবারে সত্য নহে।’
দুই পক্ষের বক্তব্য শেষে আদালত মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি।
জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১০ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় দুর্নীতির অভিযোগে এ মামলা করেছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ।
ওই মামলার অপর আসামিরা হলেন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।
অন্যদিকে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় আরো একটি মামলা করে দুদক।
মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।
এর আগে ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি’ মামলায় আদালতে হাজির না হওয়ায় জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। পরে গত বছরের ৫ এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন তিনি।





