সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগের মধ্যেই সৌদি আরবে হামলার ঘটনা নতুন করে ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলে তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনায় চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক জোট
ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটিকে সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবে হামলার পর পাকিস্তান ও তুরস্কের পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখা না যাওয়ায় চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও চুক্তি হয়েছে। ওই ব্যবস্থাতেও দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে উভয়ের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছিল। ফলে নতুন ত্রিদেশীয় জোটের পর সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় এসব প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
চুক্তি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক?
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত ও বিভিন্ন সামরিক হামলার পর সেই নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে রিয়াদ পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সৌদি আরবের লক্ষ্য হতে পারে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির সময়ে একাধিক মিত্রের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করা।
তবে কাগজে-কলমে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং বাস্তবে সামরিক হস্তক্ষেপ এক বিষয় নয়। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না, নাকি গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ বা কূটনৈতিক সহায়তা দেবে—তা নির্ভর করে চুক্তির সুনির্দিষ্ট ধারা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সৌদি আরবের নিরাপত্তা চাহিদাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার হলেও এর বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাকিস্তান নিজেও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হলেও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া দেশটির জন্যও বড় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফলে সৌদি আরব আক্রান্ত হলেই পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। সামরিক চুক্তির কার্যকারিতা মূল্যায়নে তাই শুধু তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা হয়েছে কি না, সেটিকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আরও পড়ুনঃ র’ প্রধানের বাংলাদেশ সফর ঘিরে নানা প্রশ্ন, বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক সমীকরণ
সৌদির সামনে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ঐতিহ্যগত নির্ভরতার পাশাপাশি সৌদি আরব এখন পাকিস্তান, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তবে নতুন জোট কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব সংকটের সময়ে সদস্য দেশগুলো কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর। শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই কোনো দেশকে কার্যকর সামরিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, গোয়েন্দা সহযোগিতা, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা।
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলা তাই শুধু একটি তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা নয়—এটি রিয়াদের নতুন নিরাপত্তা কৌশল ও পাকিস্তান-তুরস্কের সঙ্গে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের বাস্তব সক্ষমতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।





