তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান ব্যরিস্টার নাজমুল হুদা আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। নিজ গ্রাম রাজধানীর দোহার উপজেলার শাইনপুকুর গ্রামেই হবে তার শেষ ঠিকানা।
রোববার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাত সোয়া ১১টার দিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, একটু আগে নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা হুদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছেন। নাজমুল হুদার স্ত্রী সিগমা হুদাকে ফোন করা হলে আত্মীয় পরিচয়ে একজন জানান, রোববার রাত ১০টার দিকে নাজমুল হুদা মৃত্যুবরণ করেন। বিস্তারিত পারিবারিকভাবে পরে জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, নাজমুল হুদা অনেক দিন ধরে নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। গত সপ্তাহে তার গঠিত তৃণমূল বিএনপি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেয়েছে।
ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার জন্ম ১৯৪৩ সালের ৬ জানুয়ারি, তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশি আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা পরপর তিন বার ঢাকা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নাজমুল হুদা ব্যারিস্টার সিগমা হুদাকে বিয়ে করেছেন। তাদের দুটি মেয়ে অন্তরা সামিলা ও শ্রাবন্তী আমিনা রয়েছেন।
তিনি ২০১২ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের সময় তিনি দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৭-৯৮ সালের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন তিনি।
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান জাগো দল গঠন করলে নাজমুল হুদা জাগো দলে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হলে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন এবং তিনি ছিলেন দলের সর্বকনিষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। ১/১১ এর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে তিনটি দুর্নীতির মামলা হয়েছিল। ২০১০ সালে ২১ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। তখন তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। বহিষ্কৃত হলেও তিনি বিএনপির দলীয় কাজ করতে থাকেন এবং ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল তার সদস্য পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে ২০১২ সালে ৬ জুন নাজমুল হুদা বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন।
১০ আগস্ট ২০১২ সালে নাজমুল হুদা ও আবুল কালাম মিলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। কিন্তু কয়েক মাস পরে আবুল কালাম তাকে বিএনএফ থেকে বহিষ্কার করেন। ২০১৪ সালের ৭ মে মাসে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জোট নামে একটি জোট গঠন করেন। ২১ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি নামে দল গঠন করেন। ২০ নভেম্বর ২০১৫ সালে হুদা তৃণমূল বিএনপি নামে আরও একটি নতুন দল গঠন করেন।
২১ মার্চ ২০০৭ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হুদাকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করে, যখন তিনি ২০০১-২০০৬ সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন, ব্যবসায়ী মীর জহির হোসেনের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকার সরকারি কাজের চুক্তির বিনিময়ে ঘুষ হিসেবে ২.৪০ কোটি টাকা নিয়েছিলেন।
এ মামলায় তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আপিলের ভিত্তিতে, হাইকোর্ট ২০ মার্চ ২০১১ তাকে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছিলেন, কিন্তু ১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খালাস বাতিল করেন। ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর, হাইকোর্ট কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করেন। সুপ্রিম কোর্ট জানুয়ারি ২০১৮ সালে এ মামলায় হুদাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। আত্মসমর্পণের পর হুদাকে ৭ জানুয়ারি ২০১৯ কারাগারে পাঠানো হয়। ২১ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট এ মামলায় তাকে জামিন দেন।
বিএনপির রাজনীতিবিদ এবং ক্যাব এক্সপ্রেস লিমিটেডের মালিক গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ২৭ জুলাই ২০০৭ তারিখে হুদা এবং তার স্ত্রীর নামে ২০০৩ সালে দুটি মারুতি গাড়ির জন্য চাঁদাবাজি করার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। ঢাকার একটি আদালত ১২ জুন ২০০৮ এ মামলায় হুদাকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। কিন্তু ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে তাকে খালাস দেন।
৩ এপ্রিল ২০০৮-এ সম্পদের তথ্য গোপন করা এবং অবৈধভাবে সম্পদ আহরণের অভিযোগে হুদাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একটি আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১০ সালের আগস্টে এ মামলা থেকে তাকে খালাস দেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে বেকসুর খালাসের রায় বাতিল করেন।
১৮ জুন ২০০৮-এ দুদক হুদা ও তার স্ত্রীর নামে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা করে। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট মামলাটি বাতিল করলেও ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন। একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ জুলাই ২০১৯ হাইকোর্ট দুদককে চার মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলেন।
৯ জানুয়ারি ২০২০ দুদক হুদা এবং তার পরিবারকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬.৭৩ কোটি টাকা পাচারের জন্য দুটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে। এসব অভিযোগে ১০ মার্চ তাদের জামিন দেওয়া হয়।





