ভারতের বিজেপি সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী সত্যপাল সিং-এর দাবি, বিমানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় হিন্দু পুরাণ রামায়ণে। ২০১৫ সালে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ১০২তম ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস। সেখানে জাঁকজমক সহকারে পাঁচ ঘন্টার একটা বিশেষ অধিবেশন রাখা হয়, প্রাচীন ভারতে ঋগবেদের যুগে কী কী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আয়ত্তে ছিল- তার ব্যাখ্যানে। যার শিরোনাম ছিল: “Ancient sciences through Sanskrit”।
একজন পাইলট এবং এক স্কুল শিক্ষিকা (বিজ্ঞানীদের সভায় পাইলট ও এক স্কুল শিক্ষিকা!) সেখানে দাবি করেন, সাত হাজার বছর আগেই নাকি ভারতে বিমান চলত। এখানেই শেষ নয়। বিমানেই থেমে নেই ব্যাপারটা। ভিন গ্রহেও নাকি বিমান পাঠতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা।
ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে অবসরপ্রাপ্ত পাইলট এবং একটি বিমানচালনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান ক্যাপ্টেন আনন্দ বোডাস বলেছিলেন, কয়েক হাজার বছর আগে অন্য গ্রহেও বিমান পাঠিয়েছিলেন ভারতীয়রা। এখনকার থেকে অনেক উন্নত রেডার ব্যবস্থা ছিল – সাত হাজার বছর আগেকার ভারতে।
আনন্দ বোডাস ও অমেয়া যাদব, তাদের গবেষণাপত্রে দাবি করলেন : বৈদিক যুগেও ভারতবর্ষে জাম্বো বিমানের প্রচলন ছিল এবং সেই বিমানের প্রযুক্তি এতটাই আধুনিক ছিল যে, তা যে কোনও দিকে উড়তে পারত, এমনকি গ্রহান্তরেও যেতে পারত। বোডাস নিজে একজন পাইলট ছিলেন। যাদব একটি কলেজের অধ্যাপক। তাই তাদের গবেষণাপত্রে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রয়োজন ছিল। তারা ভৈমনিকা শাস্ত্রের উপর ভিত্তি করা একটি গবেষণাপত্র পাঠ করে এই দাবি করেছিলেন। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এই গবেষণাটি করেছিল। অথচ এই গবেষণাটি কোন মতেই ১৯০৪ সালের আগে নয়। বৈজ্ঞানিকরা যখন তাদের এই গবেষণাপত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন দক্ষিণপন্থী সমর্থকরা যুক্তি সাজিয়ে পাল্টা তর্ক না করে – আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের নামে কুৎসা রটাতে শুরু করে দিলেন।
২০১৫ সালে ভারতের একটি বিজ্ঞান সম্মেলনে এক বক্তা জানিয়েছিলেন : বিমানের আবিষ্কারক হলেন ভরদ্বাজ ঋষি। প্রায় ৭ হাজার বছর আগে তিনি এই ধরাধামে বসবাস করতেন। অর্থাৎ তার মতে, ৭ হাজার বছর আগেই বিমান আবিষ্কৃত হয়েছিল ভারতের মাটিতে! ওই বক্তার ভাষায়: “আর যদি বর্তমান যুগের কথা ধরা হয়, তাহলে বিমানের আবিষ্কারক হলেন শিবাকর বাবুজি তালপাঢ়ে!”
খোঁজ পড়ে গেছে কে এই মি.তালপাঢ়ে? যিনি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে সম্পূর্ণ ‘অজানা’ই রয়ে গেছেন! খুঁজে পাওয়া যায় নি এখনও। কিন্তু মন্ত্রী মি. সিংয়ের ওই মন্তব্য নিয়ে অনেক হাসি-মস্করা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
কিছু কাল পরে ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় আর একজন বিদ্বান দাবি করেছেন, আর্যভাটের গণিতেই নাকি ক্যালকুলাসের আদি বীজের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে আবার ফ্রন্টিয়ার পত্রিকায় একজন গণিতজ্ঞ, প্রাচীন গ্রিকদের বিজ্ঞানে অবদানের যাবতীয় কৃতিত্বই ভারতে আমদানি করবার ব্যবস্থা প্রায় পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। ভারতের দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীরা দাবি করে বসলেন, প্রাচীন যুগের গ্রিক বিজ্ঞানী পিথাগোরাস, আর্কিমিডিস, টলেমিরা ভারতীয় গুপ্তযুগের বিজ্ঞানীদের থিসিস চুরি করে- নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। অথচ উল্লেখিত গ্রীক বিজ্ঞানীরা ছিলেন, গুপ্ত যুগ শুরু হওয়ার ৫০০ থেকে ১০০০ বছর আগেকার মানুষ। এরমধ্যে বিজেপি-র এক প্রতিভাধর নেতা বলে বসলেন : রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপচারিতার পরই নাকি – হাইজেনবার্গ তার অনিশ্চয়তা সূত্রের সন্ধান পেয়েছিলেন।
বি জে পি শাসিত রাজস্থানের শিক্ষা মন্ত্রী বাসুদেব দেবনানী ২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসে বলেছিলেন, “গরুর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কতটা তা বুঝতে হবে। পৃথিবীতে গরুই একমাত্র প্রাণী, যারা অক্সিজেন প্রশ্বাস নেয়, আবার নি:শ্বাস ছাড়ার সময়েও অক্সিজেনই ফিরিয়ে দেয় প্রকৃতিতে।” বিজ্ঞানীরা যদিও তখনই আপত্তি তুলেছিলেন বাসুদেব দেবনানী নামে ওই মন্ত্রীর বক্তব্যে। তাদের কথায়, গরু অক্সিজেন নিশ্বাস নেয় আবার অক্সিজেনই প্রশ্বাস হিসাবে ছাড়ে, এই কথার কোনও ভিত্তিই নেই।
নেতা-মন্ত্রীরা নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিচ্ছেন, তো বিচারপতিরাই বা বাদ যান কেন! আর প্রজনন বিজ্ঞানই বা পিছিয়ে থাকবে কেন! তাই রাজস্থান হাইকোর্টের এক বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, ময়ূরের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে। ময়ূরকে কেন জাতীয় পাখি হিসাবে ঘোষণা করা হবে না, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ওই বিচারপতি মহেশ শর্মা সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ময়ূর হচ্ছে একমাত্র ব্রহ্মচারী প্রাণী! বিচারপতির যুক্তি, ময়ূর যখন তার চোখের জল ফেলে, ময়ূরী সেই অশ্রু পান করেই নাকি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সেজন্যই ময়ূরের ব্রহ্মচর্য কখনও ক্ষুন্ন হয় না, সে আজীবন কৌমার্য রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এরকম এক ব্রহ্মচারী পাখিরই জাতীয় পাখির মর্যাদা পাওয়া উচিত ভারতে। সামাজিক মাধ্যমে হাসির রোল পড়ে গিয়েছিল ময়ূরীর গর্ভবতী হওয়ার এই ‘নতুন’ পদ্ধতির কথা জেনে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, ময়ূরের চোখের জল খেয়ে ফেলে ময়ূরী গর্ভবতী হয়ে পড়ার এই কল্পকাহিনী অনেক পুরণো, বহুদিন ধরেই ভারতীয়রা এটা বিশ্বাস করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অন্য সব প্রাণীর মতোই শারীরিক মিলনের মাধ্যমেই যে ‘ব্রহ্মচারী’ ময়ূর অপর একটি ময়ূরীকে গর্ভবতী করে – সেটাই বিজ্ঞান।
ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লবকুমার দেব দাবি করেছিলেন, ভারতবর্ষে বেশ কয়েক হাজার বছর আগেও ইন্টারনেট ও উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। এই বক্তব্যের পর বিপ্লব দেবকে নিয়ে উপহাস কম হয়নি। তা সত্বেও নিজের দাবিতে অনড় ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। উল্টো তিনি দেশের সংস্কৃতি ও দেশের বিজ্ঞানের গৌরবজনক ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হওয়ার জন্য ভারতীয়দের দুষেছেন। বিপ্লব দেবের মন্তব্যের তীর বিদ্ধ করেছে পঞ্জাবি ও জাঠদের ৷ বাঙালিদের প্রশংসা করতে গিয়ে ভারতের অন্য প্রদেশের বাসিন্দাদের হেয় করেছেন তিনি এমনটাই অভিযোগ ৷ বিপ্লব দেব বলেছিলেন, পঞ্জাবি ও জাঠরা শারীরিক ভাবে সক্ষম হয় কিন্তু বাঙালিদের তুলনায় কম বুদ্ধিসম্পন্ন হন। অবশ্য বিজেপি বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন রাখঢাক না করেই আক্রমণ শানালেন তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বিরুদ্ধে। বললেন, ”মুখ্যমন্ত্রী আবোল তাবোল বলার মাস্টার।”
পাঞ্জাবের লাভলি নামক এক (প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের বিজ্ঞান কংগ্রেসেও শোনা গেল বহু নতুন বচন। এক মন্ত্রী জানালেন, ডারউইনের তত্ত্ব ভুল। কেননা, তার বাপ মা ঠাকুরদা ঠাকুরমা কেউ নাকি বানর থেকে মানুষ হতে দেখেনি। যা কেউ দেখেনি তা সত্য হয় কীভাবে? সত্যিই তো, কীভাবে তা সত্য হয়? এর মধ্যে কেউ কেউ আবার অনুকূল চন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিধান দিচ্ছেন – বিশেষ বটিকা সেবন করলে মহিলাদের পুত্র সন্তান প্রসব সুনিশ্চিত।
ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঐতিহ্য যে কত মহান আর সুপ্রাচীন, তা বোঝতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে বলেছিলেন, প্রাচীন ভারতেও ‘কসমেটিক সার্জারি’র প্রচলন ছিল। উদাহরণ হিসাবে মি. মোদী তুলে ধরেছিলেন হিন্দুদের দেবতা গণেশের কথা।
২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে নরেন্দ্র মোদী মুম্বাইয়ের এক প্রাইভেট হাসপাতাল উদ্বোধন করতে গিয়ে বাত্রাবিদ্যার অনুসরণে গণেশের হাতির মুণ্ড এবং কর্ণের জন্মকথা উল্লেখ করে, প্রাচীন ভারতে যথাক্রমে প্লাস্টিক সার্জারি ও জেনেটিক্স-এর যে কী বিরাট অগ্রগতি হয়েছিল, তা তুলে ধরেন। তখন একটি বাচ্চা ছেলে সামাজিক মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে লিখেছিল, “দাদু গণেশ আর হাতির ব্লাড গ্রুপ কী এক ছিল? না হলে অঙ্গ প্রতিস্থাপন তো সম্ভব নয়!”
২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ নেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, “আবহাওয়া হুট করেই খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, মেঘ ছিল…ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। এক ধরনের দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছিল যে, মেঘের মধ্যে বিমান হামলা চালানো যাবে কিনা—তা নিয়ে। এ নিয়ে (বালাকোট পরিকল্পনা) পর্যালোচনা করার সময় বিশেষজ্ঞদের অভিমত ছিল—নির্ধারিত তারিখ পরিবর্তন করা যায় কি না। আমার মনে দু’টি বিষয় ছিল। একটি হলো গোপনীয়তা…দ্বিতীয়ত। বলেছিলাম, সেখানে অনেক মেঘ ও বৃষ্টি থাকবে। আমার প্রজ্ঞা আছে, মনে হচ্ছিল মেঘ আমাদের সাহায্য করতে পারে। তখন আমরা রাডার এড়াতে পারব। সবাই খুব বিভ্রান্ত ছিল। চূড়ান্তভাবে আমি বলেছিলাম, সেখানে আকাশ মেঘলা থাকায়, ভারতীয় বায়ুসেনার বিমান পাকিস্তানের রেডার ধরতে পারবে না।” নরেন্দ্র মোদীর এই বক্তব্যের পরে সারা পৃথিবীতে হাসাহাসির রোল পড়ে যায়।
মোদীকে ভারতের নতুন ‘নেপোলিয়ন’ আখ্যা দিয়ে দেশটির সাবেক কূটনীতিক কেসি সিং এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘নিশ্চয়ই বিমানবাহিনী প্রধান জানতেন যে, মেঘের কারণে রাডারের কাজে হেরফের হয় না এবং পাকিস্তানের রাডার ভারতীয় বিমানকে চিহ্নিতও করেছিল।”
এদিকে আবার প্রতিদিন কেউ না কেউ গোমূত্র পানে ক্যান্সার করোনা সহ সমস্ত দুরূহ রোগে আরোগ্য প্রাপ্তির ভরসা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনা মহামারীর সময় দিল্লিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তরফ থেকে গণ-গোমূত্র পানের অনুষ্ঠান করা হয়। সেখানে যোগগুরু রামদেব গোমূত্র পান কালে বলেছিলেন, “কেউ এলোপ্যাথিক ওষুধ খাবেন না। গোমূত্র পান করলে করোনা সহ সমস্ত রোগ ব্যাধি ভালো হয়ে যায়।” সেই অনুষ্ঠানে রামদেব অতিরিক্ত গোমূত্র পানে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে এলোপ্যাথিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, করোনার মহৌষধ হিসেবে গোমূত্রের আড়ক বিক্রি করে, রামদেবের কোম্পানি পতঞ্জলি, হাজার হাজার কোটি টাকা কামাই করে নিয়েছে। অথচ রামদেব নিজেই প্রকাশ্যে করনার টিকা নিয়েছেন।
রামদেবের দেখাদেখি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ, করোনা মহামারীর প্রতিষেধক হিসেবে গণ-গোমূত্র পানের আয়োজন করেছিলেন কলকাতায়। এছাড়াও দিলীপ ঘোষ গরুর দুধে স্বর্ণ আবিষ্কার করার হাস্যকর দাবী করেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত বিজেপির তরফ থেকে অফিসিয়াল নির্দেশ দেওয়া হয় যে, দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যেন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সম্বন্ধে মনগড়া মন্তব্য না করেন।
ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, যে সমস্ত ভারতীয় বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম অর্জন করেছেন, তারা প্রত্যেকেই ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত। উল্লেখ্য, ভারতের কৃত্তিমান বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা প্রবন্ধ লিখে পর্যন্ত বুঝাতে চেষ্টা করেছিলেনন যে, আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ইউরোপীদের সৃষ্টি। আধুনিক বিজ্ঞানীদের কেউ বৈদিক সাহিত্য পড়ে বিজ্ঞানী হননি।




