১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট। ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা প্রত্যক্ষ করেছিল উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা—যা ইতিহাসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ বা ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ নামে পরিচিত। চার দিন ধরে চলা এই সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হন। নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় তা প্রায় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে এবং আহতের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রক্তাক্ত ঘটনার রাজনৈতিক পটভূমিতে ছিল ভারতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের গভীর বিরোধ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে মুসলিম লীগের ‘Direct Action’-এর ডাক। ১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই মুসলিম লীগ প্রত্যক্ষ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৬ আগস্টকে ‘Direct Action Day’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়। বাংলায় তখন মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায় এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ময়দানের সমাবেশ থেকে রক্তাক্ত কলকাতা
১৬ আগস্ট কলকাতার ময়দানে মুসলিম লীগের বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিনসহ মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, সমাবেশে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরাও উপস্থিত ছিল। পরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে।
সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কিত। তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকা, পুলিশি ব্যবস্থাপনা এবং Direct Action Day পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে অভিযোগ করা হয়েছে যে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল। আবার অন্য গবেষণায় কলকাতার দাঙ্গাকে একতরফা হত্যাকাণ্ড হিসেবে না দেখে উভয় সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহিংসতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ইতিহাসের বিতর্কিত একটি অধ্যায়
গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংকে শুধু একটি দিনের ঘটনা হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় সংঘর্ষ চলে। হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিহত হন, আহত হন এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারান। এই হত্যাকাণ্ডের পর নোয়াখালী, বিহার, বোম্বে ও পাঞ্জাবসহ উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনাই পরবর্তীতে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর প্রভাব ফেলে। ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, কলকাতার রক্তপাত হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাভাগের পথকে সহজতর করে।
গোপাল পাঠা—কলকাতার প্রতিরোধের এক বিতর্কিত চরিত্র
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে সামনে আসে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নাম, যিনি ‘গোপাল পাঠা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পরিবারের মাংসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই ডাকনামটি প্রচলিত হয়েছিল।
সমকালীন ও পরবর্তী বর্ণনায় গোপাল পাঠাকে এমন একজন স্থানীয় সংগঠক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যিনি কলকাতার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে কয়েকশ তরুণ সংগঠিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ আছে।
তবে গোপাল পাঠার ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আবেগের পাশাপাশি ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন। তিনি নিঃসন্দেহে ১৯৪৬ সালের কলকাতার সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন, কিন্তু তাঁকে কেবল ‘বীর’ বা কেবল ‘অপরাধী’—এই দুই চরম পরিচয়ের একটিতে সীমাবদ্ধ করলে সেই সময়ের জটিল বাস্তবতা বোঝা কঠিন হয়।
গবেষণামূলক বর্ণনায় দেখা যায়, গোপাল পাঠার নেতৃত্বাধীন দল হিন্দুদের রক্ষার উদ্দেশ্যে সংগঠিত হয়েছিল এবং দাঙ্গার সময় মুসলিম আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
কেন গোপাল পাঠার স্মরণ জরুরি?
ইতিহাসের প্রতিটি চরিত্রকে রাজনৈতিক পক্ষপাতের বাইরে গিয়ে মূল্যায়ন করা দরকার। যারা বিপদের সময়ে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন, তাদের ভূমিকা ইতিহাসে আলোচিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে যারা হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় যুক্ত ছিলেন—তাদের ক্ষেত্রেও ইতিহাসকে সত্যনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
গোপাল পাঠার গল্প সেই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন স্থানীয় সমাজ কীভাবে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করতে পারে—এবং সেই প্রতিরোধ কীভাবে আবার বৃহত্তর সহিংসতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
১৯৪৬ সালের কলকাতার ঘটনা তাই শুধু হিন্দু বনাম মুসলমানের গল্প নয়। এটি রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস, প্রতিশোধ এবং সাধারণ মানুষের অসহায়তার ইতিহাস।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা কী?
আজ ৮০ বছর পর ১৯৪৬ সালের সেই রক্তাক্ত অধ্যায় স্মরণ করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো নয়। বরং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া।
সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক ভূমিকা যেমন ইতিহাসের আলোচনার বিষয়, তেমনি গোপাল পাঠার প্রতিরোধের ভূমিকাও ইতিহাসের আলোচনায় থাকা উচিত। কিন্তু কাউকে স্মরণ করতে গিয়ে অন্য একটি সম্প্রদায়ের সব মানুষকে দায়ী করা ইতিহাসের কাজ নয়।
কলকাতার রাস্তায় ১৯৪৬ সালের যে রক্ত ঝরেছিল, তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাজনৈতিক উসকানি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা একসঙ্গে মিললে একটি শহর কত দ্রুত নরকে পরিণত হতে পারে।
গোপাল পাঠাকে স্মরণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেই স্মরণ হোক ইতিহাস বোঝার জন্য, প্রতিশোধের রাজনীতি জাগানোর জন্য নয়।
কারণ ইতিহাসের প্রকৃত দায়িত্ব হলো—কে কী করেছে তা ভুলে না যাওয়া, কিন্তু অতীতের রক্তপাতকে ভবিষ্যতের ঘৃণার জ্বালানি না বানানো।



