চীনের একদলীয় পার্টির ২০তম কংগ্রেসের সমাপনী দিনে, অত্যন্ত অসৌজন্যমূলকভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হু জিনতাওকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরাসরি সম্প্রচারের মধ্যে সংঘটিত এই ঘটনাটি যে পূর্বপরিকল্পিত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত : তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, এই ঘটনার মাধ্যমে নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন।
হু জিনতাও ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চীনের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এই সময়কালকে চীনের স্বর্ণযুগ বললেও অত্যুক্তি হবে না। হু জিনতাও উদারপন্থী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবীতে চীনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন। তার শাসনামলে অলিম্পিক (২০০৮) অনুষ্ঠানে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সমাবেত হয়েছিলেন। নানামুখী সংস্কার প্রক্রিয়ার ফলে বিশ্বের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মুখে হাসি ফুটেছিল। হু জিনতাও এর দক্ষ নেতৃত্বে চীন ইকোনমিক সুপারপাওয়ার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
চীনের খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতি রয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। এজন্য সম্ভাব্য সঙ্কট মোকাবেলার লক্ষ্যে – অর্ধশতাধিক সম্পদশালী রাষ্ট্রের দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারগুলোকে কিনে নিয়ে – সেই সমস্ত দেশের কৃষি জমি ও খনিজ সম্পদ কুক্ষিগত করে ফেলেছে চীন। পাকিস্তান ও মিয়ানমারের ভূমি ও বন্দর ব্যবহার করে, চীন বের করে ফেলেছে মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প সমুদ্র-রাস্তা। এছাড়াও বেশ কিছু দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর ও এয়ারপোর্ট রয়েছে চীনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।
চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কট্টর জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার মানুষ। তিনি তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলোকে সামান্যতম ছাড় দিতে ইচ্ছুক নন। ফলশ্রুতিতে শ্রীলংকা, পাকিস্তান, লাওস প্রভৃতি দেশ পথে বসে গেছে। আরও বহু দেশ দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
শি জিনপিং এর কট্টরপন্থী সরকার, মাও সে তুং এর শাসনামলের মতো চীনের ভৌগোলিক আয়তন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, মাও সে তুং এর সময় ভারতের কাছ থেকে লাদাখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল চীন। শি জিনপিং এর সরকারের বিরুদ্ধে ফিলিপাইন ও নেপালের ভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কে তুলনা করা হয়ে থাকে, রাশিয়ার একনায়ক জোসেফ স্ট্যালিনের এর সঙ্গে। এক সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শি জিনপিং এর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। উভয় নেতা রেকর্ড সংখ্যক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর, চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কিছুটা খারাপ হয়ে গেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের উপর জ্বালানি অবরোধ দিয়েছে রাশিয়া। এর ফলে বেকায়দায় পড়ে গেছে, পৃথিবীর অন্যতম ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার হাউস জার্মানি ও ইতালি। ব্রিটেন, ফ্রান্স সহ ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ মূল্য-স্ফীতির ফাঁদে পড়ে গেছে। ওদিকে রাশিয়ার অবিক্রিত তেল পাইপ লাইন যোগে গিয়ে জমা হচ্ছে চীনের রিজার্ভার গুলোতে। অথচ চীনকে যে দেশের মানুষ পরীক্ষিত বন্ধু বলে পরিচয় দেয়, সেই বাংলাদেশে জ্বালানির জন্য হাহাকার। কথায় বলে ‘কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ’।



