মো. আমির সোহেল বিশেষ প্রতিবেদক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের মনোনয়ন পেতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। দেশের প্রায় প্রতিটি আসনেই দলটির একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে কাজ করছেন। এমনকি বর্তমান, সাবেক এমপি ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে বেশকিছু প্রভাবশালী নেতার আসনেও মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন অনেকে। এর মধ্যে কিছু আসনে দলটির একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও রয়েছেন। একই আসনের জন্য দুই বা তিনজন কেন্দ্রীয় নেতা মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করছেন এমন চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে শাসক দলকে। যদিও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বলে দিয়েছেন, মুখ দেখে নয়, এলাকায় জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দেখে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে।
একই আসনের জন্য যেসব কেন্দ্রীয় নেতা ও প্রভাবশালীরা চেষ্টা করছেন, তাদের মধ্যে কালকিনি, ডাসার, মাদারীপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের প্রত্যেকেই এলাকায় নিজেদের অবস্থান সংহত করতে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজ নিজ কর্মীদের নিয়ে নৌকার জন্য ভোট চাচ্ছেন তারা; মনোনয়ন প্রত্যাশায় সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরছেন। তৃণমূলের মতামতের ওপর ভিত্তি করে ও এলাকার জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা দেখে মনোনয়ন দেওয়া হবে আওয়ামী লীগ ও দলটির মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বার্তার পর সবাই দল ও এলাকার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা না করার আহ্বান জানিয়ে প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, নেত্রী সবার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এলাকায় যেসব প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা আছে, নেতাকর্মীদের যারা মূল্যায়ন করেন, ত্যাগ স্বীকার করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দল থেকে এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। একই আসনের জন্য দুই বা এর বেশি কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে প্রভাবশালীরা চেষ্টা করছেন, সেক্ষেত্রে কীভাবে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জয়ের সম্ভাবনা যাদের আছে, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। এজন্যই নেত্রী বিভিন্নভাবে সবার খোঁজখবর নিচ্ছেন।
স্বাধীনতার পর থেকেই জাতীয় নির্বাচনে মাদারীপুর-৩ আসনটিকে আলাদা মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে দেখে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো। কারণ যে দলেই ক্ষমতায় আসুন না কেনো নৌকার জয় হয়েছে। এ আসনে নৌকার কান্ডারী সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন; কিন্তু তিনি গত ১০ম জাতীয সংসদ নির্বাচনে পদ্মাসেতু নিয়ে মিথ্যে মামলার কারণে অংশ নিতে পারেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা এ আসনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে এ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নিজের মতো করে কাজও করছেন। এতে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী নেতারা অসন্তুষ্ট হয়ে দলের কার্মকান্ড থেকে বিরত হয়েছেন আর জায়গা করে নিয়েছেন জামাত-বিএনপির কর্মীরা। এছাড়া এ আসনে আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদা ড. আব্দুস সোবাহান গোলাপের নামও আলোচনায় রয়েছে।
মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের মধ্যে স্থানীয় রাজনীতির আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব বেশ পুরানো। এ দুই নেতাকে কেন্দ্র করে দুইভাগে বিভক্ত সেখানকার নেতাকর্মীরা। মূলত এ কারণে বাহাউদ্দিন নাছিমের আসন হওয়ার পরও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে পাশের আসন মাদারীপুর-৩ সৈয়দ আবুল হোসেনের আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ওই নির্বাচনে সৈয়দ আবুল হোসেন মনোনয়ন বঞ্চিত হন। যদিও পরে এ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয় বিশ্বব্যাংক। তবে কৌশলগত কারণে সে সময় সৈয়দ আবুল হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও সৈয়দ আবুল হোসেনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে তৃণমূলের একটি বড় অংশ।
কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ছয় নেতা গত জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনের বাসায় দেখা করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নানা অভিযোগ ও দাবিসংবলিত একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। দল থেকে বাদ পড়া আওয়ামী লীগের ৩২ ত্যাগী নেতা এবং বিএনপি-জামায়াত থেকে এসে পদ পাওয়া ১২ নেতার একটি নামের তালিকাও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
টানা চারবার এমপি নির্বাচিত হওয়া সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ উদ্যোগে এলাকায় বহু উন্নয়ন করায় তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে নৌকা নিয়ে জয়ী হয়ে আসতে পারবে বলে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছে এমন তথ্য দিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা। তালিকা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন কালকিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মশিউর রহমান সবুজ। তিনি বলেন, ‘আমরা নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে বলেছি কালকিনির মানুষ সৈয়দ আবুল হোসেনকে আবারও এমপি হিসেবে দেখতে চায়। মানুষ তার উন্নয়নের কথা ভুলেনি।’
এ আসনে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবাহান গোলাপও রয়েছেন মনোনয়নের দৌড়ে। সময় পেলেই তিনি এলাকায় ছুটে যান; গণসংযোগ করেন নেতাকর্মীদের নিয়ে; নৌকার পক্ষে ভোট চান; সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরেন। একই আসনে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় কে এখানে মনোনয়ন পাবে তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই আগ্রহ রয়েছে। তাহলে কে হবেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-৩ কালকিনির সংসদ সদস্য!




