ইস্কান্দার মীর্জার পরিণতি: যে সামরিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনলেন, তার হাতেই ক্ষমতাচ্যুত

ইস্কান্দার মীর্জার পরিণতি: যে সামরিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনলেন, তার হাতেই ক্ষমতাচ্যুত
ইস্কান্দার মীর্জার পরিণতি

ইতিহাসে ক্ষমতার রাজনীতি কখনো কখনো এমন পরিণতি বয়ে আনে, যা রীতিমতো ট্র্যাজেডির মতো মনে হয়। পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার আলী মীর্জার জীবন তার অন্যতম উদাহরণ। যে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে তিনি নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খানের হাতেই তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।

ইস্কান্দার মীর্জার জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলার মুর্শিদাবাদে। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রতিরক্ষা সচিব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব বাংলার গভর্নরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল হন এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। সংসদীয় রাজনীতির ওপর আস্থা না রেখে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার এবং সরকার পরিবর্তনের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর আমলে পাকিস্তানে একের পর এক সরকার পরিবর্তন ঘটে। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে তিনি রিপাবলিকান পার্টি গঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন।

সামরিক শাসনের দরজা খুলে দেওয়া

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মীর্জা পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেন, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দেন এবং দেশে সামরিক আইন জারি করেন। একই সঙ্গে তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন।

এটাই শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। কারণ মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

২০ দিনের মাথায় নিজেরই ক্ষমতাচ্যুতি

১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মীর্জাকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেন। তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তিনি লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাতে শুরু করেন। অর্থাৎ যে সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে মীর্জা সংবিধান বাতিল ও সামরিক আইন জারি করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই তাঁর কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়।

ইস্কান্দার মীর্জা ও আইয়ুব খানের সম্পর্কের এই নাটকীয় পরিবর্তন পাকিস্তানের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় মীর্জা আইয়ুব খানকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন; কয়েক বছর পর সেই আইয়ুবই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠান।

লন্ডনে নির্বাসিত জীবন

লন্ডনে তাঁর জীবন ছিল অনেকটাই নিঃসঙ্গ ও সীমিত সামর্থ্যের। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, তিনি পেনশনের ওপর নির্ভর করতেন এবং অতিরিক্ত আয়ের জন্য একটি হোটেলে মধ্যপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার কাজও করেছিলেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের বর্ণনাতেও নির্বাসিত জীবনে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।

মৃত্যুর পরও পাকিস্তানে ফিরতে পারেননি

১৯৬৯ সালের ১৩ নভেম্বর, নিজের ৭০তম জন্মদিনে লন্ডনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ইস্কান্দার মীর্জার মৃত্যু হয়। তাঁর ইচ্ছা ও পরিবারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির উদ্যোগে তাঁর মরদেহ তেহরানে নেওয়া হয় এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা

ইস্কান্দার মীর্জার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ধরে রাখতে সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে সেই শক্তি একসময় নিজের নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে।

১৯৫৮ সালে মীর্জা যে সামরিক হস্তক্ষেপের দরজা খুলেছিলেন, তা পরবর্তী দশকগুলোতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক ও পরবর্তীতে পারভেজ মোশাররফের মতো সামরিক শাসকদের উত্থানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও গভীর হয়।

ইস্কান্দার মীর্জার পরিণতি তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্টের পতনের গল্প নয়; এটি ক্ষমতার জন্য সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিরও একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।

ইতিহাসের এই অধ্যায়কে বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয় হিসেবে। তবে কোনো সমসাময়িক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ‘মীর জাফর’ বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে যাচাইযোগ্য প্রমাণ ও নির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তি থাকা জরুরি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।