ভারতীয় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কিংবদন্তী নেতাজীর ১২৩ তম জন্মদিন আজ

অভিজিৎ পান্ডে, দি নিউজ ডেক্সঃ “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্বে বাংলা ভারতের স্বাধীনতাকামী জনতার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা, কিংবদন্তী মহান নেতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৩ তম শুভ জন্মদিন আজ। ভারতের স্বাধীনতাকামী সাধারন মানুষের রক্তে আগুন লাগিয়েছিলেন তিনিই। দেশ স্বাধীন করায় যার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সূর্যসৈনিক আজ সেই মহান নেতা ও স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী অক্ষয়- অমর-অমলিন-চির জাগ্রত পুরুষ নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মদিনে শতকোটি বিনম্র প্রনাম। 

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি ওড়িশার কটক শহরে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা জানকীনাথ বসুর এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। চৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে নেতাজি ছিলেন নবম।

শৈশব থেকেই মেধাবী এই নেতা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেও ইংরেজদের অধীনে কাজ করতে হবে বলে সেই চাকরিতে যোগ দেননি তিনি। তার মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল একইসাথে জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চেতনায়। রাজনৈতিক জীবনে নেতাজীর প্রেরণা ছিল স্বামী বিবেকানন্দ।

১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্পাদক এবং ১৯৩০ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন আপোসহীন এক নেতা। মাহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে প্রথমে সমর্থন করলেও পরবর্তীতে তা বর্জন করেন তিনি। তাই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অক্ষ শক্তির সাহায্যে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

ভারতবর্ষ স্বাধীন করা ও ইংরেজদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করায় নেতাজির অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হবার পরে ইতিহাস বিকৃত করে নেতাজির অবদানকে গুরুত্বহীন করে দেয়। আজকের অনেক বড় বড় নেতারা ভারত খন্ডিত হবার জন্য মহাত্মা গান্ধী আর নেহেরুকে দায়ী করে চলেছে। আর এটাও সত্যি যে দেশকে খন্ডিত করার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জীবন বলিদান দেয়নি, তারা অখন্ড ভারতকে স্বাধীন করেছিল অখন্ড ভারত পেতে।

তাদের কথায় দেশ স্বাধীন করতে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু্র তাই ভারতের জাতির পিতা একমাত্র নেতাজির হওয়া উচিৎ। তাদের যুক্তি ভারত থেকে পাকিস্থানকে আলাদা করতে মহাত্মা গান্ধীর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি তাই মহাত্মা গান্ধীকে পাকিস্তানের জাতির জনক করা প্রয়োজন। আজকে যেসব স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বেঁচে আছে আজও নেতাজির নাম শুনলে তাদের স্বাধীনতা চেতনা জাগ্রিত হয়। নেতাজিকে হারানোর বেদনায় মন কেঁদে ওঠে।

দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে আজীবন সংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসু একাধিকবার জেল–জুলুম সহ্য করেছেন। তবু তিনি আদর্শ থেকে এক চুলও সরে আসেননি। ইতিহাসকে যতই বিকৃত করা হোক ইতিহাস কখনো মুছে যায়না সত্য একদিন ঠিকই প্রকাশ পায়। তাইতো আজকের তরুন প্রজন্ম দেশপ্রেমের প্রধান নেতা হিসেবে নেতাজিকেই সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদান করে চলেছে। যুবসমাজের কাছে দেশপ্রেমের প্রধান আইকন আজ নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস।

১৯৪১-এর ১৬ জানুয়ারি নেতাজি ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে পালিয়েছিলেন৷ নানা জায়গা ঘুরে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, ইতালীয় দূতাবাসের সহায়তায় তিনি রাশিয়া হয়ে জার্মানিতে গিয়ে পৌঁছান৷ গঠন করেন যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে এক বাহিনী, যারা ইন্ডিয়ান রিজিয়নের সদস্য হলেন। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে অত দূর থেকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়োজিত থাকা যে বেশ কঠি ছিল এটা উপলব্ধি করে নেতাজি পূর্ব-এশিয়ায় চলে আসতে চান।

রাসবিহারী বসু তখন জাপানে ছিলেন। সাবমেরিন করে জাপানে পৌঁছলে রাসবিহারী বসু নেতাজির হাতে তুলে দেন ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর ভার৷ জাপান সরকার সর্বতোভাবেই এই স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতকে সাহায্য করে ব্রিটিশ-শাসনমুক্ত করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে তারা বাহিনীকে রাখতে চেয়েছিল আজ্ঞাধীন।

সুভাষচন্দ্র জাপান কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, শুধুমাত্র মিলিটারি কার্যক্রম ভারতের স্বাধীনতার জন্য পর্যাপ্ত নয়৷ চাই আলাদা প্রচার কার্যক্রম।  এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, একটি স্বাধীন সরকারের প্রতিষ্ঠা– যাকে ‘অক্ষশক্তি’ প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি প্রদান করবে। নেতাজি পূর্ণ উদ্যমে নতুন স্বাধীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নিলেন।

১৯৪৩-এর ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের ক্যাথে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে প্রতিষ্ঠিত হয় তথাকথিত প্রথম ‘স্বাধীন’ ভারতীয় সরকার ‘Provisional Government of Free India’৷ গঠিত হয় পূর্ণ মন্ত্রিসভা। আর রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রথমেই শপথ নেন সুভাষচন্দ্র বসু। নিজের হাতে রাখেন পররাষ্ট্র ও যুদ্ধবিষয়ক দফতর। অর্থমন্ত্রী এ সি চট্টোপাধ্যায়, নারীবিষয়ক মন্ত্রী লক্ষ্মী সেহগল, প্রচার ও প্রপাগান্ডা দফতরের প্রধান এস এ আইয়ার৷ এ এন সরকার-সহ আরও ১৫ জন ছিলেন মন্ত্রিসভায়। রাসবিহারী বসু মনোনীত হন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

সে রাতেই প্রধানমন্ত্রী সুভাষচন্দ্রের বাসভবনে মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে অবিলম্বে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। রাত বারোটার পর সিঙ্গাপুর রেডিও মারফত প্রধানমন্ত্রী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

একবছর দশ মাস এই স্বাধীন সরকার দেশ শাসন করেছিল। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের পূর্ব সীমান্ত ছিল এই সরকারের শাসনাধীন। কিন্তু ১৯৪৫-এর ৬ ও ৯ আগস্ট আমেরিকা অ্যাটম বোম নিক্ষেপ করায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় জাপান এবং প্রধান সাহায্যকারীর অনুপস্থিতিতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিকল্পিত পথে পূর্ণতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়।সর্বশ্রেষ্ঠ কিংবদন্তী নেতাজী

কিন্তু ২১ অক্টোবর ১৯৪৩-এ যে অন্তর্বর্তীকালীন ‘স্বাধীন’ ভারত সরকার স্থাপিত হয়েছিল তাকে স্বীকৃতি জানিয়েছিল ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ। এসব দেশের স্বীকৃতি লাভ করে প্রধানমন্ত্রী নেতাজি সুভাষের নেতৃত্বে এই সরকার প্রকাশ করেছিল ডাকটিকিট৷।চালু রেখেছিল নিজস্ব ডাকব্যবস্থা, কারেন্সি নোট৷ স্থাপিত হয়েছিল আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্ক (রিজার্ভ ব্যাঙ্ক)৷ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পরিদর্শন করে নেতাজি এ দু’টি জায়গার নাম বদলে রেখেছিলেন ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ দ্বীপ’৷ নিয়োগ করেছিলেন প্রশাসক৷ এই সরকার বিদেশে দূতাবাসও স্থাপন করে।

‘অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম’ নামে একখানা আত্মজীবনী লিখছিলেন তিনি। সেটি অসমাপ্ত থেকে যায়। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তরুণের স্বপ্ন’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে ‘দেশনায়ক’ আখ্যা দিয়ে তাসের দেশ নৃত্যনাট্যটি তাকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখেন- “স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ করে তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম।

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট এক বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র বসু নিহত হন বলে যদিও  প্রচার করা হয় তবুও এটা অমিমাংসীত রহস্য থেকেই যায় তার মৃত্যু নিয়ে।  নেতাজির মৃত্যু হয়নি প্রতিটা ভারতীয়দের মাঝে চিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। বীরের কোনদিন মৃত্যু হয়না মৃত্যু হয় কাপুরুষদের ইতিহাস বীরদের স্মরণ করে। যারা দেশকে খন্ডিত করেছে ইতিহাসকে বিকৃত করেছে আগামীর তরুন প্রজন্মের কাছে তার কৈফিয়ত দিতে হবে সেই দিন আর বেশি দূরে নয়।

ট্যাগ ‘স্বাধীন’ ভারতীয় সরকারProvisional Government of Free Indiaঅক্ষ শক্তিঅখন্ড ভারতের কিংবদন্তী মহান নেতাঅন্তর্বর্তীকালীন ‘স্বাধীন’ ভারত সরকারঅর্থমন্ত্রী এ সি চট্টোপাধ্যায়অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিমআগামীর তরুন প্রজন্মেরআজাদ হিন্দ ফৌজেআন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জইঙ্গ-মার্কিন শক্তিইতিহাস বিকৃতইতিহাসকে যতই বিকৃত করা হোকইন্ডিয়ান রিজিয়নের সদস্যইংরেজদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্যচৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে নেতাজি ছিলেন নবমজাপান সরকার সর্বতোভাবেই এই স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতকে সাহায্য করেতরুণের স্বপ্নতোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবদেশপ্রেমের প্রধান আইকন আজ নেতাজিনারীবিষয়ক মন্ত্রী লক্ষ্মী সেহগলনেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু্র ভারতের জাতির পিতানেতাজির মৃত্যু হয়নিপাকিস্থানকে আলাদা করতে মহাত্মা গান্ধীর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশিপ্রচার ও প্রপাগান্ডা দফতরের প্রধান এস এ আইয়ারপ্রধানমন্ত্রী ও বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রথমেই শপথ নেন সুভাষচন্দ্র বসুপ্রধানমন্ত্রী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাবদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছবীরের কোনদিন মৃত্যু হয়নাভারত খন্ডিত হবার জন্য মহাত্মা গান্ধী আর নেহেরুকে দায়ীভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৩ তম জন্মদিন।মহাত্মা গান্ধীকে পাকিস্তানের জাতির জনকরাজনৈতিক জীবনে নেতাজীর প্রেরণা ছিল স্বামী বিবেকানন্দরাসবিহারী বসুরাসবিহারী বসু মনোনীত হন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসর্বশ্রেষ্ঠ কিংবদন্তী নেতাজী

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Ovi Pandey
সংবাদ প্রতিনিধি

Ovi Pandey

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।