তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠন করা হবে এবং কারা এতে থাকবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মতামত ও প্রস্তাব এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। জনগণের জন্য উপযোগী যে প্রক্রিয়াকে সংসদ গ্রহণযোগ্য মনে করবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি জানান, বৈঠকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল, বার্তা সংস্থা, সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এর আগে সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়।
বিভিন্ন অংশীজনের দেওয়া লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে কমিটির সভাপতি বলেন, পরবর্তী সময়ে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হবে। আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব ও ভিন্নমত রয়েছে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কী কী ধাপ অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে একাধিক বিকল্প প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক করতে সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। কোনো বিরোধী দলের বক্তব্য বা প্রস্তাব থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র হওয়ায় এ ধরনের সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বৈঠকে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য থাকায় কমিটি সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এগোতে চায়। সংসদে নতুন কোনো প্রস্তাব এলে সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ সময় ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে বিভিন্ন মতামত এসেছে বলে জানান তিনি। কারও কারও মতে, এ ধরনের সীমা গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় যে ১০ বছরের সীমার প্রস্তাব দিয়েছিল, সে অবস্থান থেকে সরে আসেনি বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, জনগণ কোনো নেতাকে পুনরায় দায়িত্বে দেখতে চাইলে সেই সুযোগ থাকা উচিত—এমন মতও আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুযোগ তৈরি না হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণয়ন ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, কমিটি সেটি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান কমিটির সভাপতি। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সনদের কোনো বিষয়ে ভিন্ন প্রস্তাব থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, বিশেষ কমিটি পর্যায়ক্রমে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করবে। একই সঙ্গে গত ১৭ বছরে বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার এবং জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের সদস্যদের মতামত নেওয়া হবে।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত সংগ্রহের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরে সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এর ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে এবং সংসদের ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তিনি জানান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য এবং জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের সঙ্গেও কমিটি আলোচনা করবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তি ছিল ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন। এসব কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে কাজ করেছে।
অন্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বর্তমানে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার বাধ্যতামূলক অংশ নয় বলেও জানান তিনি। তবে প্রয়োজন হলে সরকার ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করে সুপারিশ নিতে পারে। তাঁর মতে, গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে আলাদা কমিশন গঠন করা হলে সেই কমিশনের বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশও পরবর্তীতে বিবেচনা করা সম্ভব।
কমিটির সভাপতি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক সংবিধান সংশোধনী প্রণয়ন করাই বিশেষ কমিটির লক্ষ্য।





